• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

মুসলমানদের ঐক্য অপরিহার্য


মুহাম্মাদ আবু আখতার ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১, ০৩:৪০ পিএম
মুসলমানদের ঐক্য অপরিহার্য

ঢাকা : মুসলমানরা যতদিন ঐক্যবদ্ধ ছিলেন ততদিন কোনো বাতিল শক্তি তাদের মোকাবিলায় টিকে থাকতে পারেনি। আর বাতিল শক্তি এটা ভালোভাবেই জানে যে, মুসলমানরা যতদিন ঐক্যবদ্ধ থাকবেন, ততদিন তাদের পতন ঘটানো সম্ভব নয়। তাই তারা অতি সূক্ষ্ম কৌশলে মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা শুরু করে। তাদের এ অপচেষ্টা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেও ছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় তাদের ষড়যন্ত্র ধূলিসাত করে দেন এবং মুসলমানদের ঐক্য অটুট রাখেন। মুসলমানরা তখন সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলা করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা তাদের ভালোবাসেন যারা তার পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো।’ (সুরা আস-সাফ : ৪)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের সময় মদিনায় আউস ও খাজরাজ নামে দুটি গোত্র ছিল। জাহেলি যুগে উভয় গোত্রের মধ্যে চরম শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ ছিল। তাদের মাঝে দীর্ঘদিন যাবত যুদ্ধবিগ্রহ চলছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পর উভয় গোত্র ইসলাম গ্রহণ করলে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ পয়দা হয়। দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে গিয়ে তারা পরস্পর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারা উভয় গোত্র মিলে মক্কার নির্যাতিত অসহায় মুহাজির মুসলমানদের মদীনায় আশ্রয় দান করে। ফলে তাদের মাঝে সুদৃঢ় ঐক্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষী ইহুদিদের এটা সহ্য হলো না। তারা মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরার অপচেষ্টা চালাতে লাগল।

একদিন উভয় গোত্রের কয়েকজন লোক মিলে কথাবার্তা বলছিল। এমন সময় একজন ইহুদি তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে তাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে জাহেলি যুগে তাদের পরস্পরের শত্রুতার কথা স্মরণ করে দিল। এর ফলে দুই গোত্রের মুসলমানদের পরস্পরের প্রতি প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠল। ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ ভুলে গিয়ে পরস্পরের মাঝে যুদ্ধের উপক্রম হলো। এ খবর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌছার পরপরই এ আয়াত তার ওপর নাজিল হয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার সামনে এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রশিকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।’ (সুরা আলে ইমরান : আয়াত নং ১০৩) এ আয়াত নাজিলের পর ইহুদিদের ষড়যন্ত্র ধূলিসাত হয়ে যায়। এ আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী সাহাবায়ে কিরাম (রা.) আবারো সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ হন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মুনাফিক সর্দার ছিল আবদুল্লাহ বিন উবাই। সে মৌখিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও মনেপ্রাণে ছিল ইসলামের কঠোর দুশমন। মুসলমানদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টির ব্যাপারে সে প্রাণপনে চেষ্টা করেছিল। একটি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টির অপচেষ্টার ঘটনা বর্ণনা করে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, এক যুদ্ধে আমরা উপস্থিত ছিলাম। এ সময় জনৈক মুহাজির এক আনসারীর নিতম্বে আঘাত করলেন। তখন আনসারী ‘হে আনসারী ভাইগণ!’ বলে সাহায্য প্রার্থনা করলেন এবং মুহাজির সাহাবি, ‘হে মুহাজির ভাইগণ!’ বলে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনে বললেন, কী খবর, জাহিলি যুগের মতো ডাকাডাকি করছ কেন? তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, এক মুহাজির এক আনসারীর নিতম্বে আঘাত করেছে। তিনি বললেন, এমন ডাকাডাকি পরিত্যাগ কর। এটা অত্যন্ত গন্ধময় কথা। এরপর ঘটনাটি আবদুল্লাহ ইব‌নে উবাইয়ের কানে পৌঁছল। সে আনসারদের উত্তেজিত করার জন্য বলল, আচ্ছা, মুহাজিররা এমন কাজ করেছে? ‘আল্লাহ্‌র কসম! আমরা মদিনায় ফিরলে সেখান থেকে প্রবল লোকেরা (আনসাররা) দুর্বল লোকদের (মুহাজিরদের) অবশ্যই বের করে দিবে।’ এ কথা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছল। তখন উমর (রা.) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসুল! আপনি আমাকে অনুমতি দিন। আমি এক্ষুনি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিচ্ছি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ কথা বলতে না পারে যে, মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সঙ্গী-সাথীদের হত্যা করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৯০৫)

এমনিভাবে আল্লাহতায়ালা ইসলামবিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্র ধূলিস্যাত করে সাহাবিদের মাঝে ঐক্য অটুট রাখেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর ইসলামের শত্রুরা বসে থাকেনি। যুগে যুগে তারা এ অপচেষ্টা করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলতাও পেয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে। আজ পর্যন্ত তারা অভিনব কৌশলে মুসলমানদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টির জন্য অবিরাম অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : আলেম, প্রাবন্ধিক