• ঢাকা
  • রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭

হাত-পা নেই, তবুও রং পেনসিলে স্বপ্ন দেখে রাসেল


মো. মেহেদী হাসান জানুয়ারি ১২, ২০২১, ১১:৫৭ এএম
হাত-পা নেই, তবুও রং পেনসিলে স্বপ্ন দেখে রাসেল

ছবি: সোনালীনিউজ

ঢাকা : ‘মগবাজার ওয়ারলেস রেল গেটের পাশেই উৎসুক জনতার ভিড় দেখে নিজেও এগিয়ে গেলাম। দেখলাম হাত-পা কাঁটা একটি ছেলে তার অর্ধ দু’হাত আর থুথুনিতে ভর করে আর্ট পেপারের উপর উঠে বসে পেনসিল চড়াচ্ছিল। মনোযোগ নিয়ে অন্যান্যদের মতো আমিও তার পেনসিল ঘুরানো দেখছিলাম। প্রথমে ভাবছিলাম হয়তো সে কোন ম্যাজিক দেখাবে। তাই অধীর  আগ্রহে সে কি করছে তা দেখতেছিলাম। যখন ছেলেটা আর্ট পেপারে একটু একটু করে একটা পুরো দৃশ্য একে ফেললো। তখন আমার কাছে বিষয়টা ম্যাজিকের মতোই লাগলো। ভাবলাম হাত-পা কাঁটা একটা ছেলে কিভাবে এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারে? আমি ২শ’ টাকা দিয়ে ওর কাছ থেকে ছবিটা নিয়ে এসেছিলাম।’

এভাবেই হাত-পা হারানো এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কর্মগুণের বর্ণনা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (এফডিসি) পরিচালক সমিতির অফিস সেক্রেটারি মো. রবিউল ইসলাম শুভ।

রাসেলের আঁকা চিত্রকর্ম (ছবি: সোনালীনিউজ)

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ছেলেটার নাম মো. রাসেল ইসলাম। ১৯৯৬ সালে বরিশাল জেলার উজিরপুরের বরাকোঠা ইউনিয়নের গড়িয়া গ্রামে রাসেলের জন্ম। শৈশবে বাবা-মা তাকে নিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকা আসলেও পরবর্তীতে তারা গ্রামে চলে যায়। কিন্তু রাসেল ঢাকায় থাকতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতো। আর দশটি সুস্থ্য স্বাভাবিক শিশুর মতোই কৈশরের দূরন্তপনায় বেড়ে উঠে রাসেল। কিন্তু সে যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে (বয়স আনুমানিক ১০ বছর) তখন এক দমকা হাওয়ায় পাল্টে যায় তার জীবনের গতিবেগ।   

আরও পড়ুন: ঘুষ না দিতে পারায় সরকারি চাকরি মেলেনি ‘খর্বকায়’ আলী হোসেনের

এরপর রাসেলের দুটো হাত ও একটি পা শরীর থেকে অর্ধেকটা কেটে ফেলতে হয়। বর্তমানে জীবন সংগ্রামী রাসেল তার অসম্পন্ন শারীরিক গঠন নিয়েও নিজের প্রায় প্রতিটি কাজই নিজে থেকে করার চেষ্টা করে। দূর থেকে দেখলে যেন মনেই হয়না রাসেল একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। রাজধানীর মালিবাগ রেললাইনের পাশের বস্তিতে গিঞ্জি পরিবেশের একটি ছোট্ট বাসায় ভাই রুবেল ইসলাম ও ভাবি আকলিমা আকতারের সঙ্গে থাকে সে।

ছবি: সোনালীনিউজ

প্রায় ২০ বছর আগে রাসেল তার পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় আসে, যখন তার বয়স ছিলো আনুমানিক ৫ বছর। অভাবের সংসারে তাকে বিদ্যালয়ে পাঠানো কিংবা শিক্ষাব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব ছিল রাসেলের বাবার পক্ষে। তবুও স্ত্রী, চার ছেলে ও তিন কন্যার সংসারে রাসেলকে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় তার বাবা। ছেলেকে ভর্তিও করিয়েছিলো পশ্চিম মালিবাগের ‘শিশু নীড়’ স্কুলে।

রাসেলের বাবা মো. বাবুল ফকির জানান, ‘ওর বয়স যখন ১০ বছর তখন একদিন ও ওর বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে কমলাপুর রেললাইনে যায়। আর সেদিন থেকে ওকে আমরা এক মাস ৫ দিন খুঁজে পাইনি। তারপর এক রিকশা চালক একদিন এসে আমাদেরকে ওর সন্ধান দেয়। তার কাছে জানতে পারি ও কমলাপুরে ট্রেনের ধাক্কায় রাস্তার পাশে পড়ে ছিলো। পরে সেই রিকশা চালক ওকে নিয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। রিকশা চালক জানিয়েছে, তখন তার কাছে ২০ হাজার টাকা থাকলে রাসেলের পা কেঁটে ফেলতে হতো না। তবে ওর হাত দুটো ট্রেনের ধাক্কায় পুরোপুরি কেঁটে ফেলার অবস্থায় ছিল।’

ছবি: সোনালীনিউজ

রাসেলের বাবা আরও জানান, ‘ছেলেটা ছোটবেলায় ভালো পড়াশোনা করতো। আমাদের কষ্টের সংসার ঠিকভাবে না চললেও ওকে আমরা পড়াশোনা করাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একটি দুর্ঘটনায় ওর দুটো হাত ও একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। তারপরও ওকে আমরা আবারও স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে ও অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের সাথে ভালোভাবে মিশতে পারতো না। তাই বেশিদিন স্কুলে যায়নি। তবে ছবি আঁকার প্রতি ওর অনেক আগ্রহ ছিলো। আমি ওর ছবি আঁকা দেখে চিন্তা করি, ছেলেটার দুটো হাত নেই তবুও এত সুন্দর ছবি আঁকে কিভাবে?’

এখন রাসেলের বাবা গ্রামে একটি চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তবে সেই সংসারে রাসেল তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কেন থাকেন না জানতে চাইলে বাবা মো. বাবুল জানান,‘ওকে আমরা আমাদের কাছে রাখতে চাই। কিন্তু ও গ্রামে থাকতে চায় না। আর গ্রামের ছেলে-মেয়েরা ওকে নিয়ে মজা করে সেজন্য ও কারো সাথে মিশতে পারে না। ও ঢাকাতে থাকতেই বেশি পছন্দ করে।’

ছবি: সোনালীনিউজ

বর্তমানে রাসেল ওর ভাই-ভাবির সঙ্গে ঢাকাতে থাকে। রাসেলের যাবতীয় দেখাশুনা করেন ওর ভাই ও ভাবি।

রাসেল দৈনন্দিন জীবনে তার নিজস্ব কাজের কতটুকু করতে পারেন জানতে চাইলে তার ভাই রুবেল ফকির জানান, ‘রাসেল মোটামুটি সব কাজই নিজে নিজেই করতে পারে। পোশাক পরা, খাবার খাওয়া, এমনকি ওর সৌচাগারের কাজও সে নিজে নিজে করে। আমার স্ত্রী ওকে মাঝে মাঝে ভাত খাইয়ে দিতে চায় কিন্তু তাতে ও তৃপ্তি পায় না। তাই রাসেল মাথা প্লেটের কাছে নিয়ে নিজের অর্ধেক হাত দিয়েই খাবার খায়। তবে ওর ভাবি কাপড়-চোপড় ধোয়া ও কষ্টকর এমন কাজগুলোতে সাহায্য করে।’

ছবি: সোনালীনিউজ

প্রতিবন্ধী হিসেবে রাসেল সরকারি, ব্যাক্তি কিংবা কোন প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পায় কী না জানতে চাইলে মো. রুবেল ফকির জানান, ‘বেশ কয়েক বছর ও প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও গত কয়েকমাস হলো সেটাও বন্ধ আছে। নতুন কার্ড দেয়ার কথা বলে পুরনো কার্ডটি নিয়ে গেছে। কিন্তু এখনও নতুন কার্ড দেয়নি। সেজন্য ওর প্রতিবন্ধী ভাতা বন্ধ আছে। এছাড়া রাসেল আর কোন সহায়তা পায়না।’   

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘শিশু নীড়’ স্কুলে মাত্র চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ হয় রাসেলের। সে সময়েই তার ছবি আঁকার হাতে খড়ি হয়েছিল। শত বাঁধা বিপত্তির পরও থেমে যায়নি ছবি আঁকার প্রতি টান। তাইতো এখনও মনে পড়লেই বসে পড়ে রং তুলির খেলা খেলতে। একটা সময় স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে আর্টিস্ট হওয়ার। কিন্তু দারিদ্রতা তার সেই স্বপ্নে কুঠারাঘাত বসিয়েছে। যা তাকে ভিক্ষাবৃত্তি পেশা বেছে নিতে বাধ্য করেছে। তবুও ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা কমেনি তার। কেউ বললেই রাস্তায় কিংবা বাসায় গিয়ে ছবি একে দেয় রাসেল।

ছবি: সোনালীনিউজ

কিভাবে সময় কাঁটে আর ছবি আঁকতে কেমন লাগে জানতে চাইলে রাসেল জানায়,‘আমার কোন বন্ধু নেই। আমি কারো সাথে মিশি না। আমি সব সময় একা একাই থাকি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করি আর সময় পেলে রং পেনসিল নিয়ে ছবি আঁকি। আমার ছবি আঁকা দেখে অনেকে খুঁশি হয়ে টাকা দেয়। কেউ কেউ টাকা দিয়ে ছবি বাসায় নিয়ে যায়। অনেকে আবার রং পেনসিল ও কাগজ কিনে দিয়ে আমাকে ছবি আঁকতে বলে। ছবি আঁকতে আমার খুব ভালো লাগে।’

শারীরিক প্রতিবন্ধীতায় বদ্ধ জীবনে ভিক্ষাবৃত্তির পরিবর্তে সম্মানজনক কোন কাজ করতে ইচ্ছে হয়, জানতে চাইলে রাসেল বলেন, ‘আমি ছবি আঁকা নিয়েই স্বপ্ন দেখি। ছবি আঁকার কাজ পেলে করব। আর কখনো সুযোগ পেলে একটা দোকান দিয়ে ব্যবসা করব। আমি নিজে থেকে দোকানের সব কাজ করতে পারবো না। আমার ভাই রুবেল ভ্যান চালায়, ওকে নিয়ে আমরা দুই ভাই ব্যবসা করব।’

ছবি: সোনালীনিউজ

“নবীর শিক্ষা, করোনা ভিক্ষা, মেহনত কর সবে” শেখ হাবিবুর রহমানের ‘নবীর শিক্ষা’কবিতার লাইনটি হয়তো আমরা সকলেই মুখে মুখে কিংবা বইয়ের পাতায় পড়েছে।

তাছাড়া, ভিক্ষাবৃত্তি হারাম না হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয় ঘৃণ্যতম  কাজ, এটাও সকলেরই জানা আছে। তবুও জীবিকার তাগিদে যদি ভিক্ষাবৃত্তি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা, তখনও কি আমরা এটাকে ঘৃণা আর অবহেলার চোঁখে দেখবো? মানবিকতা সম্পন্ন বেশিরভাগ মানুষের উত্তর হবে ‘না’।

ছবি: সোনালীনিউজ

তাহলে কি আমরা মানব বিবেককে প্রশ্ন করতে পারিনা যে, কেনইবা আমরা সব ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণিত পেশায় ওজন করি, আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে যে ভিক্ষাবৃত্তি তাও কি ঘৃণিত পেশা হবে?

কেউ এই অসহায় ছেলেটির সাহায্যে এগিয়ে আসতে আগ্রহী হলে ০১৭৪৯২৭২৯৮৫ এই নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।

সোনালীনিউজ/এমএইচ