ফাইল ছবি
রোনালদো নাজারিওর দুই গোলে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম শিরোপা জেতার পর পার হয়ে গেছে পুরো দুই যুগ। ১৯৫৮ সালে প্রথম শিরোপা জেতার পর থেকে কখনোই এত লম্বা সময় বিশ্বকাপ ট্রফির জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি ব্রাজিলকে। ষষ্ঠ শিরোপা জিততে মরিয়া ব্রাজিল তাই এবার বিশ্বকাপে এসেছে আটঘাট বেঁধেই। ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সহায়তায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ের খুঁটিনাটি সকল ডেটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছেন কার্লো আনচেলোত্তি ও তার কোচিং স্টাফ। উদ্দেশ্য একটাই, কোথায় কোথায় খেলোয়াড়দের উন্নতি করতে হবে সেই ডেটা বিশ্লেষণ করে মাঠে সফলভাবে প্রয়োগ করা।
ব্রাজিলের ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই প্রতিটি খেলোয়াড়ের হৃদস্পন্দন, দৌড়ের গতিবেগ, ক্লান্তির মাত্রা এবং ইনজুরি থেকে পুনর্বাসন- সব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। এরপর সঠিক সময়ে তা তুলে দিয়েছেন জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের হাতে।
ট্র্যাকিং ভেস্ট:
ব্রাজিল জুড়ে বেশিরভাগ পেশাদার ফুটবলারই এখন জার্সির নিচে সেন্সর লাগানো ‘স্মার্ট ভেস্ট’ পরে খেলতে ও অনুশীলনে নামেন। পুরো মৌসুমে ক্লাবে খেলার সময় তারা এটি ব্যবহার করেন। এতে করে তারা মাঠে কীভাবে এবং কতটুকু নড়াচড়া করছেন, কতটুকু পরিশ্রম করছেন, ইনজুরি ঠিকভাবে সারছে কি না, সব তথ্যই জমা হয় ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের কাছে।
এই প্রযুক্তি অবশ্য ব্রাজিল একা না, এই বিশ্বকাপের মোটামুটি সব দলই ব্যবহার করছে। তবে ব্রাজিল এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম শুধু পুরুষ জাতীয় দলেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। পুরুষ ও নারীদের সব ক্লাব থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক দলগুলোতেও এই সংস্কৃতি চালু করেছে, যেন একটি নবীন ফুটবলারের বেড়ে ওঠার সময়ের সব তথ্যও ভাণ্ডারে থাকে এবং তা প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
নির্দিষ্ট বিরতিতে ক্লাবগুলো তখন নিজ নিজ ফুটবলারদের যাবতীয় তথ্য জাতীয় দলের ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে পাঠিয়ে দেয়। এতে করে সারা বছর ধরেই জাতীয় দলের কোচিং স্টাফেরা তাদের খেলোয়াড়দের পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।
ব্রাজিল জাতীয় দলের ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান গুইলহের্মে পাসোস এই প্রসঙ্গে বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘যখন খেলোয়াড়েরা আমাদের সাথে থাকে না, তখন আমরা প্রতিদিন ক্লাবগুলোর কাছ থেকে সব খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করি। পরবর্তীতে সেগুলো আমাদের ডেটাবেজে চলে যায় এবং আমরা সেগুলোকে বিশ্লেষণ করি’।
জাতীয় দলের প্রস্তুতির জন্য এই প্রযুক্তিকে বড় আশীর্বাদ মনে করছেন পাসোস। কারণ বছরে খুব কম সময়ের জন্যই জাতীয় দলে খেলোয়াড়েরা একত্রিত হোন। একেকজন খেলেন একেক মহাদেশের একেক ক্লাবে। ট্র্যাকিং প্রযুক্তির কারণে খেলোয়াড়েরা কে কীরকম শারীরিক অবস্থায় আছে, সেটি নিয়ে আর বেশি দুশ্চিন্তা করতে হয় না জাতীয় দলকে।
বিশেষ করে ফুটবলারদের হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে পুনর্বাসনের কাজে এই প্রযুক্তি খুব সহায়ক। আর খেলোয়াড়টি যদি হন দ্রুতগতির কেউ, তাহলে তার পেশীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া ও সতেজ রাখার জন্য এই ডেটা ব্যবহার করা হয়।
একাদশ ও স্কোয়াড নির্ধারনে সহায়তা:
সারা বছর ধরে সংগ্রহ করা এসব উপাত্ত স্কোয়াডে কোন পজিশনে কোন খেলোয়াড়কে নেয়া হবে এবং ট্যাকটিকস কী হবে এসব নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেউ হয়তো বা ক্লাব থেকে ইনজুরিগ্রস্ত হয়ে আসছেন, আবার কেউ বা ক্লাবে অতিরিক্ত খেলার কারণে ক্লান্ত। সবকিছু বিবেচনা করেই তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কোন সময়ে দলে কাকে ডাকা হবে।
দলের ট্যাকটিকাল সিদ্ধান্ত নির্ধারণেও এসব উপাত্ত ভূমিকা রাখে। যেমনটা পাসোস বলছেন, ‘কোচের হাতে যদি একজন দ্রুতগতির উইঙ্গার থাকে, তাহলে সে হয়তো তাকে শুরু থেকেই না খেলিয়ে বদলি হিসেবে খেলাতে পারে, যে হঠাৎ নেমে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেবে। এই সিদ্ধান্তগুলো আগে থেকেই নিয়ে রাখা সহজ হয় প্রযুক্তির কারণে’।
শুধু এতদিনের অনুশীলনেই নয়, এবারের বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই ব্রাজিলের ফুটবলাররা এই ট্র্যাকিং ভেস্ট পরে মাঠে নামবেন। বেশি গরমে খেলা হওয়ার কারণে খেলোয়াড়দের ক্লান্তি সম্পর্কিত তথ্য সরাসরি জমা হবে ডেটাবেজে। এতে করে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে কে পরের ম্যাচের জন্য প্রস্তুত, আর কার একটু বেশি বিশ্রাম দরকার।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোচের হাতেই:
প্রযুক্তির সহায়তায় লাখ লাখ তথ্য পাওয়া গেলেও দিনশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কোচ আনচেলোত্তির হাতেই। এক্ষেত্রে পাসোস একটি উদাহরণ দিয়েছেন, ‘ট্র্যাকিং ডেটা থেকে আমরা দেখলাম, একজন খেলোয়াড় পুরো ম্যাচে মাত্র ৬ কিলোমিটারের মতো দৌড়াচ্ছে, যা বাকিদের চেয়ে অনেক কম। শুধু সংখ্যা দেখলে মনে হবে ওই ফুটবলার হয়তো ঠিকভাবে পারফর্ম করছে না। কিন্তু ফুটেজ বিশ্লেষণের সময় কোচের নজরে পড়লো অন্য একটি জিনিস। এই খেলোয়াড়টি প্রতিবার সঠিক সময়ে সঠিক ট্যাকটিকাল পজিশনে চলে যাচ্ছে। কম দৌড়ালেও সে ছিল মাঠে ভীষণ কার্যকরী’।
এতসব প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কি কার্লো আনচেলোত্তি পারবেন ব্রাজিলকে কাঙ্ক্ষিত সেই ষষ্ঠ ট্রফি এনে দিতে?
এসএইচ







































