ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়ন হতে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত অন্যতম পুরাকীর্তি গোরক্ষনাথ মন্দির। মন্দিরটি ও মন্দিরের ভেতরে অবস্থিত কূপটি অলৌকিকভাবে বেলে পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। প্রায় ১১শ বছরের পুরোনো এই মন্দির ও বৈচিত্র্যময় আশ্চর্য কূপ ও এর পানি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে মহাপবিত্র এবং এটি তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে। এছাড়াও এখানে প্রতিবছর ফাল্গুনের শিব চতুর্দশী তিথীতে পূণ্যস্নানের জন্য আগমন ঘটে অসংখ্য পূণ্যার্থীর।
পাপ মোচনের উদ্দেশে প্রতিবছর এই গোরকই কূপের পানিতে স্নান করতে আসেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লাখ লাখ হিন্দু নারী-পুরুষ। নানা মনবাসনা নিয়ে এই কূপে স্নান করেন তারা, পূজা দেন শিবমন্দিরে। এই কূপের পানিকে গঙ্গার পানির মত পবিত্র মনে করেন তারা। এছাড়া শুদ্ধিকরণের জন্য শরীরে ছিটিয়ে দেওয়া হয় এই কূপের পানি। কূপটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল- এর পানি দিয়ে লাখ লাখ মানুষ স্নান করার পরেও কূপের পানি এক ইঞ্চিও কমে না।
কথিত আছে, গুপ্ত যুগ থেকে সেন যুগের মধ্যে অর্থাৎ ৯২০ খ্রিস্টাব্দের সময় এই কূপ ও মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। নাথ সহজিয়ার মতে, গুরু গোরাক্ষ নাথের নামানুসারে কুপের এবং স্থানের নাম করণ করা হয়েছে গোরকই। আর এই ‘গোরকই’ ফরিকি স্নান বা বারুনীর মেলা হিসেবে আজও সমানভাবে সমাদৃত। তাই প্রতিবছর ফাল্গুনের শিব চতুর্দশী তিথীতে পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় ‘গোরক্ষনাথ বারণী’ নামে মেলার। আর এই কূপে স্নান করতে ও শিব চতুর্দশী তিথীতে পূঁজা উপলক্ষে মেলায় বিভিন্ন জেলার নানা বয়সী লাখ লাখ নারী-পুরুষের সমাগম হয়।
নেকমরদ হতে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ‘গোরকই’ নামক স্থানে গোরক্ষনাথ মন্দির। এখানে গোরক্ষনাথ মন্দির ছাড়াও আছে নাথ আশ্রম। গোরক্ষনাথ মন্দির স্থানীয়ভাবে গোরকই মন্দির নামেও পরিচিত। মন্দির চত্বরে আছে মোট ৫টি মন্দির। এছাড়াও আছে ৩টি শিবমন্দির ও ১টি কালি মন্দির। নাথ মন্দিরটি চত্বরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। মন্দিরের পেছনে রয়েছে কূপটি। পাথর দিয়ে তৈরি একটি ছোট চৌবাচ্চার মাঝে নিচু স্থানে ঐ কূপটি অবস্থিত। কূপটি বড় বড় কালো পাথরের খণ্ড দিয়ে নির্মিত। এ কূপের একেবারে নিচু অংশটুকু পর্যন্ত পাথর দিয়ে বাঁধানো। উত্তারাঞ্চলের লাখ লাখ হিন্দু নারী-পুরুষ পাপ-মোচনের জন্য এই কূপের পানিতে স্নান করার উদ্দেশে এখানে আসেন।
মন্দিরের উত্তরে আছে একটি পান্থশালা। পান্থশালার দরজায় একটি ফলক বা গ্রানাইট শিলালিপি ছিল যা বর্তমানে ঢাকা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও এ মন্দিরে গ্রানাইট পাথরের বহুল ব্যবহার দেখা যায়।
মন্দিরটির সম্পর্কে আরও কথিত আছে, গোরক্ষনাথ ছিলেন নাথ পন্থীদের ধর্মীয় নেতা খীননাথের শিষ্য। নবম-দশম শতাব্দির মধ্যভাগে গোরক্ষনাথের আবির্ভাব ঘটে। তিনি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে এখানে মন্দির স্থাপন করেন। অলৌকিক ওই কূপটি সেই সময়ে নির্মিত বলে প্রবীণদের ধারণা। আবার অনেকের মতে, গোরক্ষনাথ কোনো ব্যক্তির নাম নয়, এটি একটি উপাধি মাত্র। গোরক্ষনাথ অথবা উপাধি চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য এই মন্দির ও আশ্রম নির্মাণ করা হয়।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা বলেন, এখানে প্রতিবছর এই মেলা করা হয়। মেলায় অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তারা মূলত বিভিন্ন মনবাসনা নিয়ে আসেন। এখানে এসে প্রথমে এই কূপে স্নান করে শিবমন্দিরে পূজা করলে অনেকের সেই মনবাসনা পূরণ হয়। গঙ্গার জল আমাদের ধর্মে যেমন পবিত্র তেমনি এই কূপের পানিও আমাদের কাছে পবিত্র। তাই এই পানি দিয়ে আমরা গোসল করি। কেউ আবার শুদ্ধিকরণের জন্য শরীরে পানি ছিটিয়ে দেয়।
দর্শনার্থীরা আরও বলেন, এই মন্দির ও কূপটি কে তৈরি করেছে তা আমাদের জানা নেই। তবে আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে শুনেছি যে, এই কূপটি নাকি অলৌকিকভাবে নির্মিত হয়েছে। এখানে এসে কূপটিতে স্নান করে মন্দিরে পূজা করেছি যাতে আমার মনবাসনা পূরণ হয়।
মেলা আয়োজক কমিটি ও মন্দিরের সভাপতি কাশীনাথ বর্মন বলেন, ৯২০ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু দেশ থেকে এই গোরক্ষনাথ ও তার বন্ধু নাসির উদ্দিন নামে দুই জন এখানে আসেন। গোরক্ষনাথ এখানে বসবাস শুরু করেন ও নেকমরদে নাসির উদ্দিন। তখনই এখানে অলৌকিকভাবে মন্দির ও কূপটি নির্মিত হয়। তবে কিছু মন্দির আমরা সংষ্কার করে নির্মাণ করেছি। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডু মেলার সঙ্গে মিল রেখে আমরাও এখানে গোরক্ষনাথ শিব রাত্রীব্রত মেলা করে আসছি। শিবরাত্রীব্রত করলে ও কূপে স্নান করলে আমাদের মনস্কামনা এবং আশা পূরণ হয়, পাপও মোচন হয়। এই এলাকার মানুষ দরিদ্র হওয়ায় আমরা মন্দিরের ও কূপের সংস্কার করতে পারছি না। তাই মন্দির ও কূপটিকে সংস্কার করার জন্য সরকারকে দাবি জানাচ্ছি। অনুরোধ করছি এই মেলাটিকে ব্যাপক পরিসরে করতে আমাদের সহযোগিতা করার।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, মেলা উপলক্ষে প্রায় শতাধিক বিভিন্ন ধরণের মালা, শাখা-সিদুর, খেলনা ও মুখরোচক খাবারের দোকান বসেছে। এছাড়াও শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে নাগর দোলা। মেলায় দোকান দিয়ে অনেকের বাড়তি আয়ের সুযোগও হয়েছে। মেলাটি শুরু হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি এবং শেষ হবে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে।
সোনালীনিউজ/এম







































