ঢাকা: ৫০ বছর পরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন হবে, তা ১৯৭১ সালে বলাটা খুবই কঠিন ছিল। মোটামুটিভাবে সবাই একমত ছিলেন যে বাংলাদেশের টিকে থাকা কঠিন হবে।
তা ছাড়া ১৯৭২ বা ’৭৩ সালে অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর, তৈরি পোশাক খাত ছিল না, প্রবাসী আয়েরও তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। এমনকি কৃষি খাতও ছিল সবুজ বিপ্লবের অপেক্ষায়। তবে ২৫ বছর পর বাংলাদেশ নিয়ে অনুমান করা হয়তো কিছুটা সহজ ছিল। আর এ কাজটিই করার চেষ্টা করেছিল বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল ১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। বিশ্বব্যাংক তখন বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল।’ সেই বিশ্বব্যাংকই ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ২০২০: একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত সমীক্ষা শিরোনামে বাংলাদেশ নিয়ে একটি গবেষণা করে। অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় যাবে—এটাই ছিল গবেষণার বিষয়বস্তু।
বিশ্বব্যাংকের সেই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২০ সাল হবে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ এক সময়। তখন বাংলাদেশের বয়স হবে ৫০ বছর। এ জন্য বাকি আছে আরও ২৫ বছর। এ সময় বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানবসম্পদে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
গবেষণায় ২৫ বছরের মধ্যে অর্জন করতে হবে এ রকম বেশ কিছু লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল সেই গবেষণায়। লক্ষ্যগুলো ছিল—দারিদ্র্যের হার দ্রুত নামিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির হার ৭-৮ শতাংশে উন্নীত করা, ৫ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানিপণ্য বহুমুখীকরণ, পরিবেশের কার্যকর সংরক্ষণ, ২০২০ সালের মধ্যে বার্ষিক ৮০০ কোটি ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আনা ইত্যাদি।
বিশ্বব্যাংক ১৯৯৫ সালেই ২০২০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন হবে, তার একটি ছক তৈরি করেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব কটি লক্ষ্যই অর্জন করেছে বাংলাদেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়েও রয়েছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আনা—এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধি হলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থান হয়নি, কমেনি আয়ের বৈষম্য।
আজ ১৬ ডিসেম্বর, ২০২১ বাংলাদেশ পাকিস্তানের থেকে বিজয় লাভ করার ৫০তম বছর অতিবাহিত করলো। বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কৃষিনির্ভরতা কমেছে, বেড়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প ও সেবা খাতের গুরুত্ব।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি: স্বাধীনতার পরবর্তী (১৯৭৩-৮০ সময়ে) বাংলাদেশে গড়ে ৩.৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। বর্তমান দশকে (অর্থবছর ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত) বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি হার দাঁড়ায় ৬.৭ শতাংশ। কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী অর্থবছর ২০১৮-১৯ এ আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৫ শতাংশ। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ ধরে বাজেট করা হয়েছিল। অর্থবছরজুড়ে ছিল কোভিড-১৯–এর প্রভাব। সাময়িক হিসাব করে পরে এটি করা হয় ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছি। যা এশিয়ার সব দেশের চেয়ে বেশি। আর মহামারির স্থবিরতা কাটিয়ে চলতি ২০২১-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭.২ শতাংশ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মাথাপিছু আয়: স্বাধীনতার আগে মাথাপিছু আয় ছিল ১০০ ডলারের মতো, ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশিত ফলাফল দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পেরেছে। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চার দশক আগে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশেরও বেশি। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুসারে দারিদ্র্যের হার ২৪.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
আমদানি-রপ্তানি: ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৮৩ মিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা ১৯৭৪-৭৫ এর তুলনায় ৮৮ গুণ বেশি। অন্যদিকে বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ৫ হাজার ৭২৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৫৪.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যা ছিলো ১৯৭৪-৭৫ সালের তুলনায় ৩৯ গুণ বেশি।
পোশাক খাত: স্বাধীনতা পরবর্তী পাঁচ দশক পর বাংলাদেশে রপ্তানি খাতে বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে রপ্তানি আয়ের ৭০ ভাগ ছিল পাটের দখলে। কৃত্রিম তন্তু আবিষ্কারের ফলে সত্তরের দশকেই পাটের চাহিদা কমে যায়। আশির দশকে ধীরে বিকাশ লাভ করে শ্রমঘন পোশাক খাত। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে একমাত্র চীনের পরেই এর অবস্থান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হচ্ছে এই পোশাকশিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশই আসছে এ খাত থেকে (অর্থবছর ২০২০-২১)।
ঔষধ শিল্প: গত এক দশকে ঔষধ শিল্প থেকে রপ্তানি আয় বেড়েছে এগারো গুণ। বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭টি ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ১৪৭টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ।
বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স: বর্তমানে বিশ্বের ১৬৮টি দেশে কাজ করছেন বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ কর্মী। প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হচ্ছিলো, তবে গত ২০২০ সালে কেভিড-১৯ জনিত কারণে মাত্র ২.২ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে অষ্টম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। কেভিড-১৯ সময়ে বাংলাদেশসহ মাত্র ৩টি দেশ রেমিট্যান্স প্রবাহে ধনাত্মক ধারায় ছিল। এই রেমিট্যান্সের পরিমাণ আমাদের মোট জিডিপি’র প্রায় ৫.৫ শতাংশ, রপ্তানি আয়ের অর্ধেক (৫৪%) এবং প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের প্রায় তিনগুণ (নিট বৈদেশিক সাহায্য ৬ বিলিয়ন)। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তিন মাসে ৭.০৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে।
রিজার্ভ: ২০২১-২২ অর্থবছরের অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সর্বশেষ রিজার্ভে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে দেশে রিজার্ভের পরিমান বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো চার হাজার ৭০০ কোটি ডলারে। দেশে এ ধরনের বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ সৃষ্টি হওয়াটা যে কোনো বিচারেই বিরাট অর্জন। কোনো দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকলেই তাকে সন্তোষজনক রিজার্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়। আমাদের বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে দেশের প্রায় নয় মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
বাজেটের আকার: ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব বাজেট ছিল ২৮০ কোটি টাকা। রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট মিলে তা ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মাত্র ছয়টি ব্যাংক ছিল। বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী মিলে মোট ব্যাংক রয়েছে ৬১টি। এসব ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫২টি শাখার সমন্বয়ে বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। শহর ও গ্রামের শাখা প্রায় সমান। ডিসেম্বর ২০২০ শেষে সবগুলো ব্যাংক শাখায় সাড়ে ১২.২৩ কোটির বেশি আমানতকারী ও প্রায় ১.০২ কোটি ঋণ গ্রহীতা রয়েছে। আর মোট আমানত ও ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১৪ হাজার ১৪৫ ও ১১ হাজার ৫৭ বিলিয়ন টাকা।
শেয়ারবাজার: ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড উপমহাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন স্টক এক্সচেঞ্জ। ‘দি ইস্ট পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ এসোসিয়েশন লিমিটেড' নামে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর (প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর) আনুষ্ঠানিকভাবে লেনদেন শুরু হয় নাল্লায়ণগঞ্জের কো-অপারেটিভ ভবনে। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালের ১৩ মে ইস্ট পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড থেকে এর নাম পরিবর্তন করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে স্টক এক্সচেঞ্জটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষ হলে মাত্র ৯টি কোম্পানি নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জটির নব যাত্রা হয়। কোম্পানিগুলো হলো- আলফা টোবাকো ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ অক্সিজেন লিমিটেড, বাংলাদেশ টোবাকো কোম্পানি লিমিটেড, বার্মা ইস্টাল লিমিটেড, ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, গ্ল্যাক্সো বাংলাদেশ লিমিটেড, জিএমজি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশন লিমিটেড, আইসিবি বাংলাদেশ ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানি লিমিটেড এবং দি ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। তখন ওই কোম্পানিগুলোর অপরিশোধিত মূলধন ছিলো ১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সেখান থেকে এখন স্টক এক্সচেঞ্জটিতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৫টি। সে হিসেবে স্বাধীনতা পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশের শেয়রবাজারে তালিকাভূক্ত কোম্পানি বেড়েছে ৩৮ গুণ। আর এই সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ কোটি টাকায়। জিডিপিতে যার অবদান ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
খাদ্য উৎপাদন: বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। একাত্তরের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন হয়েছে (অর্থবছর ২০২০-২১)। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ খুব সামান্যই চাল আমদানি করেছে। বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, ধান ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, আম ও আলু উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
সোনালীনিউজ/এআর







































