• ঢাকা
  • বুধবার, ০৪ আগস্ট, ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮
abc constructions

খাদ্যসংকট মোকাবিলায় জাতীয় ফল কাঁঠাল


নিউজ ডেস্ক জুন ১৬, ২০২১, ০৪:০৮ পিএম
খাদ্যসংকট মোকাবিলায় জাতীয় ফল কাঁঠাল

ঢাকা : কাঁঠাল জাতীয় ফল হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কারণ-সহজ প্রাপ্য, দামে সস্তা, পুষ্টিগুণ বেশি, আকারে বড় এমন একটি ফল পরিবারের সকলে মিলে খাওয়া যায়। কাঁঠালের কোনো অংশই অপ্রয়োজনীয় নয়। পাকা কাঁঠালের কোষ সুস্বাদু খাবার, বাকল গবাদি পশুর খাদ্য, বীজ ও কাঁচা কাঁঠাল তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়। গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি কৃষক পরিবারে বসতবাড়ির আশপাশে কম-বেশি কাঁঠাল গাছ দেখা যায়। একটি বড় গাছ থেকে শতাধিক কাঁঠাল পাওয়া যায়। কৃষকরা  মৌসুমে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে কাঁঠাল বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আয় করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং শিকাগো বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদ জীববিদ্যা ও সংরক্ষণ বিভাগের শিক্ষক নাইরি জেরেগা বলেন, কাঁঠালের অনুকূল আবাস গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ফলটির ‘যথাযথ ব্যবহার’ নেই। মার্কিন এ গবেষকের বক্তব্যের সত্যতাও রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে একসময় বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হলেও এখন ফলটির কদর কমে এসেছে। অথচ বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে সম্ভাব্য খাদ্যসংকট মোকাবিলায় কাঁঠালের উৎপাদন বৃদ্ধি একটি সমাধান হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন।

বৃক্ষে জন্মানো ফলের মধ্যে কাঁঠাল সবচেয়ে বড়। বাংলা ভাষায় প্রবাদবাক্য আছে-‘কাঁঠালের আঠা’, ‘গাছে কাঁঠাল  গোঁফে তেল’ ইত্যাদি। কাঁঠাল আসাম ও বার্মার চিরসবুজ বনেও ফলে। কাঁঠালের আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, যেখানে আজো বুনো কাঁঠাল ফলে। কাঁঠাল (ঔধপশভৎঁরঃ) এক প্রকারের হলদে রঙের সুমিষ্ট গ্রীষ্মকালীন ফল। বৈজ্ঞানিক নাম অৎঃড়পধৎঢ়ঁং যবঃবৎড়ঢ়যুষষঁং। কাঁচা কাঁঠালকে বলা হয় এঁচোড়। এটি প্রায় ১০০ পাউন্ড (৪৫ কেজি) পর্যন্ত হতে পারে। কাঁঠালগাছের কাঠ আসবাবপত্র তৈরির জন্য অত্যন্ত সমাদৃত। বাংলাদেশে কাঁঠাল নামে পরিচিত হলেও থাইল্যান্ডে কানুন, মালয়েশিয়ায়  নাংকা, চীনে পো লো মি, ভারতে কানঠাল/কাঁঠাল/পেনাসা এবং ভিয়েতনামে মিট নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ জোনাথান ক্রেন বলেছেন, কাঁঠালগাছ বহুবর্ষজীবী হওয়ায় এটি প্রতি বছর রোপণের প্রশ্ন আসে না। গ্রীষ্মকালীন একেকটা গাছে পাঁচ থেকে সাত বছর যাবৎ ফল ধরে। কোনো কোনো গাছে বছরে ১৫০ থেকে ২০০টি কাঁঠাল ধরে। বাংলাদেশ, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণ ভারত, বিহার, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় ব্যাপকভাবে কাঁঠালের চাষাবাদ হয়। তবে ব্রাজিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জ্যামাইকা প্রভৃতি দেশে সীমিত আকারে কাঁঠাল জন্মে। সারা বাংলাদেশে কম-বেশি জন্মালেও নওগাঁ, দিনাজপুর, সাভার, ভালুকা, মধুপুর ও সিলেট কাঁঠাল প্রধান এলাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এদেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন কাঁঠাল ফলে। তবে কদর এখন কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদনও কম হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও ভারতে চাষকৃত কাঁঠালের জাত হলো-গালা ও খাজা। গালা ও খাজা কাঁঠালের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হিসেবে ‘রসখাজা’ নামে আরেকটি জাত আছে। এছাড়া আছে রুদ্রাক্ষি, সিঙ্গাপুর, সিলোন, বারোমাসি, গোলাপগন্ধা, চম্পাগন্ধা, পদ্মরাজ, হাজারী প্রভৃতি জাতের কাঁঠাল। তবে এদের মধ্যে হাজারী কাঁঠাল বাংলাদেশে আছে, বাকিগুলো আছে ভারতে। আকার, ওজন, রং, স্বাদ ও বৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁঠালের স্থানীয় নাম রয়েছে। যেমন, লাউয়ের মতো দেখতে কাঁঠালকে লাউ কাঁঠাল, মধু রঙের কাঁঠালকে মধুরসা কাঁঠাল, খাওয়ার অংশ শক্ত এমন কাঁঠালকে চাইলা কাঁঠাল, দুধের মতো স্বাদ ও রং এমন কাঁঠালকে দুধরসা কাঁঠাল বলা হয়ে থাকে। এছাড়া কাঁঠালের স্থানীয় নামের মধ্যে রয়েছে-বেল কাঁঠাল, শসা কাঁঠাল, হাজারী কাঁঠাল, কুমুর কাঁঠাল, টেমা কাঁঠাল, ঢেওয়া কাঁঠাল, গুতমা কাঁঠাল, টেপা কাঁঠাল, সারিন্দ কাঁঠাল, গালা কাঁঠাল, পানিরসা কাঁঠাল, দুধরসা কাঁঠাল, মধুরসা কাঁঠাল, চিনিরসা কাঁঠাল, তরমুজ কাঁঠাল, কুমুর কাঁঠাল, রসগোল্লা কাঁঠাল, দুইসিজন কাঁঠাল, বিন্দি কাঁঠাল, বাইল্যা কাঁঠাল, পাতা কাঁঠাল, বল কাঁঠাল, খাজা কাঁঠাল প্রভৃতি।

দেশে বাড়ুক কাঁঠাল চাষ : জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ এক তথ্যে জানা যায়, ২০ বছর ধরে বাংলাদেশে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে ফল উৎপাদন বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে বিশ্বের ফল উৎপাদনের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এফএও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে তারা বলেছে, অন্যতম পুষ্টিকর ফল কাঁঠালকে বলা হয় মাংসের বিকল্প। সারা বিশ্বে বছরে ৩৭ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল হয় ভারতে, ১৮ লাখ টন। দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ, ১০ লাখ টন। পুষ্টিমানের দিক থেকে অন্যতম সেরা এই ফলের আমদানি খুব দ্রুত হারে বাড়াচ্ছে চীন। তারা মূলত উৎপাদনে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে কাঁঠাল আমদানি করে। জাপান, মালয়েশিয়ার মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কাঁঠাল আমদানির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত তিনটি উন্নত কাঁঠালের জাত উদ্ভাবন করেছেন। রামগড়ের পাহাড়াঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ প্রায় তিন বছর সফল গবেষণার পর বারি কাঁঠাল-৩ নামের বারোমাসি কাঁঠালের নতুন জাত উদ্ভাবন করেন। প্রত্যন্ত এলাকায় সারাবছর ফল দেয়া একটি কাঁঠাল গাছের সন্ধান পাওয়ার পর রামগড় পাহাড়াঞ্চলে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০১১ সাল থেকে এ গাছটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তারা তিন বছর গাছটির সার্বিক তত্ত্বাবধান, পরিচর্যা ও জার্মপ্লাজম নির্বাচন করে একটি নতুন জাত উদ্ভাবনে সফল হন। এর মধ্যে বারি-১ জাতের উচ্চফলনশীল কাঁঠাল পাওয়া যাবে বছরের মে-জুন, উচ্চফলনশীল অমৌসুমি জাত বারি-২ কাঁঠাল পাওয়া যাবে জানুয়ারি-এপ্রিল এবং নিয়মিত ফলদানকারী উচ্চফলনশীল বারোমাসি বারি-৩ পাওয়া যাবে সেপ্টেম্বর-জুন মাস পর্যন্ত।  উদ্ভাবিত এ তিনটি জাত সারা দেশেই আবাদযোগ্য। বারি-৩ এর উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১৩৩ মেট্রিক টন, বারি-১-এর উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১১৮ মেট্রিক টন ও বারি-২-এর উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৫৮ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংস-এর তথ্যে জানা যায়, কাঁঠালের জমি ক্রমান্বয়ে কমছে। কাঁঠাল উৎপাদনের তথ্যসারণিতে দেখা গেছে-২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৭৬ হাজার ২৯৫ হেক্টরে ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৫৪৯ মেট্রিক টন, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ৭৯ হাজার ১২ হেক্টরে ১৬ লাখ ৯৪ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন এবং ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ৭৯ হাজার ৯৪৭ হেক্টরে ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৯ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছে।

কদর  বাড়ছে বিশ্বে : গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পশ্চিমা নানান দেশগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিজ উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে সেসব দেশে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বাণিজ্যিকভাবে কাঁঠাল চাষের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারই প্রমাণ মিলে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও জাতিসংঘের সতর্কীকরণ প্রতিবেদনে। তারা বলছে, গম ও ভুট্টা চাষ নির্ভর অনেক দেশে আশঙ্কাজনকভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে তাপমাত্রার বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে। যার কারণে সেখানে খাদ্য ঘাটতির যে আভাস পাওয়া যাচ্ছে এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কাঁঠালের দিকে এখন দৃষ্টি দিয়েছেন। জেনে অবাক হবেন, ফিলিপাইনের মতো দেশ যেখানে খুব বেশি কাঁঠাল উৎপাদন হয় না। তারা ভিয়েতনাম থেকে কাঁঠালের হিমায়িত পাল্প নিয়ে ইনস্ট্যান্ট কুইক ফ্রিজ (আইকিউএফ) পদ্ধতিতে কাঁঠাল সংরক্ষণ করে নিজেদের চাহিদা পূরণ এবং রপ্তানিও করছে। আবার ভিয়েতনাম রপ্তানির পাশাপাশি কাঁঠালকে কাজে লাগাচ্ছে মুখরোচক খাবার তৈরিতে।

খুলছে নতুন শিল্প সম্ভাবনার দুয়ার : জেনে আনন্দিত হবেন, বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, চকলেটের মতোই সুগন্ধ রয়েছে কাঁঠাল বীজে। কোকো বিনসের তুলনায় সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ার কারণে চকোলেটের উপকরণ হিসেবে ক্রমেই বাড়ছে কাঁঠাল বীজের চাহিদা। ব্রাজিলের সাও পওলো ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানাচ্ছেন, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৩৭ লক্ষ টন চকলেট উৎপন্ন হয়। চকলেটের অন্যতম উপাদান কোকো বিনসের বার্ষিক চাহিদা ২০২০ সালের মধ্যে ৪৫ লক্ষ টনে পৌঁছাবে। গবেষকরা কোকো বিনসের বিকল্প অনুসন্ধানে ২৭টি বিভিন্ন প্রাতির কাঁঠাল বীজের গুঁড়ো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেন, কাঁঠালের মধ্যে থাকা বেশ কিছু যৌগের কারণে চকলেটের মতো সুগন্ধ বের হয়। তাই চকলেট প্রস্তুতে কাঁঠাল বীজকে বিকল্প হিসেবে ভাবছেন গবেষকরা। বাংলাদেশসহ যেসব দেশে অধিক কাঁঠাল উৎপাদন হয় তাদের মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে কাঁঠালের শিল্প রয়েছে। শুকনা কাঁঠাল, ক্যানভর্তি জুস এবং ক্যানে কাঁঠাল সংরক্ষণ করে বিক্রি ও রপ্তানি করছে। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে আটা, নুডলস, পিঠা ও আইসক্রিম তৈরি করছে। কাঁঠাল দিয়ে এক প্রকার মিষ্টি স্বাদের স্যুপ প্রস্তুত হয় ভিয়েতনামে। ভারত ও থাইল্যান্ডে কাঁঠাল ফল হতে জ্যাম, জেলি, জুস তৈরি করা হয়। শ্রীলঙ্কায় ভাতের বিকল্প খাবার হিসেবে চিপস, স্ন্যাকস, স্যুপ, সালাদ, ডেজার্ট তৈরি এবং সবজি হিসেবে কাঁঠাল ব্যবহূত হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সরকারি সহযোগিতায় গড়ে উঠছে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। সেখানে কৃষি গবেষণা সংস্থা ও খাদ্য প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে কাঁঠাল থেকে উৎপাদিত ক্যান্ডি, জ্যাম, জুস, সিরাপ, আইসক্রিম স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে। ব্রাজিলে শুকনা কাঁঠালের চিপস তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। আমাদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগ কাঁঠালের ওপর গবেষণা করে কাঁঠাল থেকে জ্যাম, জেলি, কেন্ডিজ, নেকটার, মারমালেড  তৈরির গবেষণায় সফল হয়েছেন। বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ কাঁঠাল হতে বিস্কুট ও ক্যান্ডি প্রস্তুত করেছে। আশা জেগেছে কাঁঠালের বিচির পাউডার গমের ময়দার সাথে মিশিয়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বিস্কুট, কেক তৈরি করা যাবে। গবেষণা মতে, কাঁঠালের কোষ খাওয়ার পর যে খোসা বা রিন্ড থাকে তা যথেষ্ট পরিমাণে পেকটিন আছে যা জেলি বা জ্যাম তৈরিতে ব্যবাহার করা যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, কাঁচা কাঁঠাল ভালো করে ছিলে টুকরা করে ধুয়ে অল্প পরিমাণ পানি, সামান্য লবণ ও হলুদ দিয়ে ফ্রাইপ্যানে ১০ মিনিট সিদ্ধ করে নিতে হবে। সিদ্ধ করার সময় মাঝে একবার ওপর-নিচ করে দিতে হবে। এরপর ভালো করে পানি ঝরিয়ে ঠান্ডা করে জিপার লক ব্যাগ বা পলিব্যাগে ভরে ডিপ ফ্রিজে রেখে সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়। কাঁঠালের কোষ থেকে বিচি আলাদা করে জিপার ব্যাগে কোষ ভরে ডিপ ফ্রিজে অনেক দিন রেখে খাওয়া সম্ভব। কেউ যদি কোষ থেকে রস বের করে তা এয়ার টাইট ব্যাগে ভরে ডিপ ফ্রিজে রাখে, তবে সেটাও বছরখানেক ধরে খাওয়া সম্ভব।

ক্ষুধা মেটাবে বাংলার ফল কাঁঠাল : কাঁঠালকে বলা হয় গরিবের পুষ্টি। কারণ এত সস্তায় এত পুষ্টি উপাদান আর কোনো ফলে পাওয়া যায় না। কাঁঠালকে বিস্ময়কর ফল হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ময়কর এই ফলটি বিশ্বের কোটি মানুষকে অনাহারের হাত থেকে বাঁচাতে পারে বলেও অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও গবেষণা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খরা বা অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক ঘটনার কারণে গম বা ভুট্টার ফলন ব্যাহত হলেও কাঁঠালের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা হবার আশঙ্কা নেই। গবেষকদের মতে, পাকা কাঁঠালের পাশাপাশি বীজ ও কাঁচা ফল ভুট্টা, গম ও মাংসের বিকল্প হতে পারে। অপর এক গবেষণায় উঠে এসেছে বিশ্বে  ৬ কোটি ৬০ লাখ শিশু পেটে ক্ষুধা নিয়ে স্কুলে যায়। যাদের মধ্যে প্রতি নয়জনের একজন অপুষ্টির শিকার। এসডিজি ঘোষণা অনুযায়ী জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে এই অবস্থার অবসান করতে চাচ্ছে। এসডিজির এই লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল-এমনটিই ধারণা জাতিসংঘের। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আঠাবিহীন এবং অন্যান্য জাতের কাঁঠালের চারা আনা হয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে আনা আঠাবিহীন কাঁঠালের গাছে ইতোমধ্যে ফলও ধরেছে। কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগের কথা ভাবা হচ্ছে। প্রতিকুল অবস্থায়ও বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ভারত রয়েছে প্রথম স্থানে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং নেপালের অবস্থান ৩য়, ৪র্থ এবং ৫ম। কাঁঠাল খনিজ পদার্থ, ভিটামিন, শর্করার ইত্যাদির মত নিত্য নৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের উৎস হিসেবে কাজ করে। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে কাঁচা অবস্থায় ৯.৪ গ্রাম এবং পাকা অবস্থায় ১৮.৯ গ্রাম শর্করা, কাঁচা অবস্থায় ২.৬ গ্রাম এবং পাকা অবস্থায় ২.০ গ্রাম আমিষ, কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায় ১.১ গ্রাম খনিজ লবন এবং যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন পাওয়া যায়। কাঁঠাল রান্না করা ছাড়াই সরাসরি খাওয়া যায় বলে এর পুষ্টি উপাদান অবিকৃত অবস্থায় দেহে শোষিত হয়।

কাঁঠালের বিশ্বযাত্রার গল্প : ‘প্রজেক্ট জ্যাকফ্রুট’: ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম ডেইলি মেইল ইউকেতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ব্রিটিশ তরুণ জর্ডান গ্রেসন ও অ্যাবি রবার্টসন নিজেদের প্রতিদিনের খাবারে মাংসের বিকল্প অনুসন্ধানে ‘প্রজেক্ট জ্যাকফ্রুট’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। মজার ব্যাপারটি হচ্ছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তারা কাঁঠাল দিয়ে তৈরি করেছেন বার্গার, মিট বলের মতো খাবার। তাদের উদ্দেশ্যটি আরো মজার, শূকরের মাংসের বিকল্প হিসেবে কাঁচা কাঁঠালের নানা ধরনের রান্না নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালাচ্ছেন। কাঁঠাল দিয়ে তারা আরো যা করতে চাচ্ছেন তার মধ্যে রয়েছে-ময়দার বিকল্প হিসেবে কাঁঠালের বীজের গুঁড়োর রুটি বা কেক তৈরি।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন বলা হয়েছে, অ্যাবি রবার্টসনের কাঁঠাল নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টির পর একদিন কাঁঠালবিষয়ক একটি নিবন্ধ থেকে জানতে পারেন, একটি প্রমাণ সাইজের পাকা কাঁঠালে একটি পরিবারের এক বেলার আহার সম্পন্ন করা সম্ভব। তারপর থেকেই অ্যাবি রবার্টসন ও জর্ডান গ্রেসন ভারত থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করে বিপণন, কাঁঠালের পুষ্টিগুণ ও রান্নায় কাঁঠালের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। অনুসন্ধানে তারা জানতে পারেন, বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনে সমৃদ্ধ দেশ এবং এই ফলটি বাংলাদেশের জাতীয় ফল। অ্যাবি রবার্টসন ও জর্ডান গ্রেসন মন্তব্য করে লিখেছেন, কাঁঠাল নিয়ে এশিয়ায় একটা দারুণ বৈপরীত্য দেখি। সেখানে হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে থাকে অথচ সেখানকার দৈব ফল কাঁঠাল নষ্ট হচ্ছে। ‘প্রজেক্ট জ্যাকফ্রুট’-এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে তারা কাঁচা কাঁঠালই সবজি ও বিকল্প মাংস হিসেবে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেন। তখন প্রতিটি কাঁঠালের সঙ্গে অবশ্য রেসিপিও দিতে হয়েছে ভোক্তাদের। অ্যাবি রবার্টসন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলায়ও আগামীতে কাঁঠাল ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা মাংসের বিকল্প হিসেবে পুরো ইংল্যান্ডে কাঁঠালের প্রচলন শুরুর চেষ্টা করছি।

রপ্তানি হচ্ছে জাতীয় ফল : বাংলাদেশে প্রচুর উৎপাদন সত্ত্বেও কাঁঠাল হতে বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুত ও রপ্তানির তেমন উদ্যোগ নেই। সামান্য পরিমাণে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। কাঁঠালের বাণিজ্যিক ব্যবহার যেমন নেই, রপ্তানিতেও তেমন গতি নেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ৩৯৩ টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭০০ টনের মতো কাঁঠাল। কাঁঠালের জনপ্রিয়তা বাড়াতে বাজারজাত সম্প্রসারণ করা জরুরি।

কাঁঠালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা : ভারতীয় উপমহাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে ফলটিকে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে কাঁঠাল জনপ্রিয় করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে কাঁঠাল বাণিজ্য থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে। প্রবাসী বাঙালিরা বাংলাদেশি কাঁঠাল খুব বেশি পছন্দ করেন। কয়েক বছর ধরে হবিগঞ্জের বড় ও ভালো কাঁঠাল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যে লন্ডন, সৌদি আরব, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানমতে, দেশে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর কাঁঠাল আবাদ হয়, তাতে উৎপাদন ২ লাখ ৬০ হাজার টন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ১০ টন কাঁঠাল। উৎপাদন কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ, যেমন দিনাজপুর, ঢাকা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় উৎপাদন হচ্ছে, প্রায় দেড় লাখ টন। এছাড়া টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট ও পাবনা জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন হয়। হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারীভাবে অত্যন্ত পুষ্টিকর কাঁঠাল ফলের ফলন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর।

সংরক্ষণে জাগবে সম্ভাবনা : সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার কাঁঠাল পচেগলে নষ্ট হয়। কৃষকদের স্বার্থে ভালুকায় ও হবিগঞ্জে হিমাগার স্থাপন করা জরুরি। প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে কাঁঠাল রফতানি করেও প্রচুর বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করাও সম্ভব। তাজা ফল প্রক্রিয়াজাত করে অন্যান্য দেশের মত জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি, জুস, স্যুপ, বিস্কুট, ময়দা, আটা, নুডুলস, আইসক্রিম ইত্যাদি তৈরির জন্য মধুপুর, ভালুকা, মাওনা, রামগড়, শ্রীমঙ্গল এলাকায় শিল্প স্থাপন করতে হবে। শিল্প করা সম্ভব হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিল্পজাত দ্রব্য ও কাঠ দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আশা আছে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং উন্নয়ন গবেষক
[email protected]

 

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit
Dutch Bangla Bank Agent Banking
Wordbridge School