ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা: এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ, ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধার আশঙ্কা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। একদিনেই নাসডাক-১০০ সূচকের বাজারমূল্য কমেছে ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট সূচক একদিনে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ‘লিবারেশন ডে’-এর পর এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় একদিনের পতন। অন্যদিকে, নাসডাক-১০০ সূচক কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এতে একদিনেই বাজারমূল্য থেকে মুছে গেছে প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
বৃহস্পতিবারের এই ব্যাপক দরপতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় বিজয়ের পর ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যের ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণের ওপর পরিবেশগত ও স্থানীয় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার, অবকাঠামোগত চাপ এবং স্থানীয় জনগণের বিরোধিতার কারণে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন পেতে বিলম্ব হতে পারে।
জোনসট্রেডিংয়ের প্রধান বাজার কৌশলবিদ মাইকেল ও'রুর্ক বলেন, নির্বাচনের ফলাফলে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, বিশেষ করে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর পদে তাদের সাফল্য, ডেটা সেন্টার নির্মাণের গতি কমে যাওয়ার বিষয়টিকে বাজারের প্রধান উদ্বেগে পরিণত করেছে।
চিপ ও এআই কোম্পানির শেয়ারে বড় পতন
বৃহস্পতিবারের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে সেমিকন্ডাক্টর ও নিওক্লাউড কোম্পানিগুলোর শেয়ার। ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক ১২ শতাংশ কমে ছয় মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।
এদিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ার কমেছে ৯ শতাংশ। অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের (এএমডি) শেয়ার দরপতন হয়েছে ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া অ্যামাজন ও অ্যালফাবেটের শেয়ারও প্রতিটি ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
এআই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য পরিচিত নিওক্লাউড কোম্পানি কোরউইভের শেয়ার কমেছে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, নেবিয়াসের শেয়ার দরপতন হয়েছে ১৫ শতাংশ। গত ৬ অক্টোবর নাসডাক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর থেকে এই দুই কোম্পানির শেয়ারের দাম অর্ধেক বা তারও বেশি কমেছে।
কোরউইভের পাঁচ বছর মেয়াদি ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপ (সিডিএস) স্প্রেড বেড়ে রেকর্ড ১ হাজার ২৬৭ দশমিক ৯ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছেছে। ঋণখেলাপির ঝুঁকি সম্পর্কে বাজারের ধারণা পরিমাপের অন্যতম সূচক এটি। একই সময়ে ইন্টেলের পাঁচ বছর মেয়াদি সিডিএস স্প্রেডও রেকর্ড ১৪৯ দশমিক ৭ বেসিস পয়েন্টে উঠেছে।
ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা আরও বাড়তে পারে। এসব স্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ গ্রিড ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইউবিএসের বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের যে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা, তার প্রায় ৩০ শতাংশ নির্মাণ স্থগিতের ঝুঁকিতে রয়েছে।
গ্রানাইট ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রুস জারো বলেন, মানুষের বসতবাড়ির কাছাকাছি ডেটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ এবং পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা তৈরি হতে পারে। অনেক প্রকল্পের অনুমোদন এখনো বাকি থাকায় সামনে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
এআইয়ের সম্ভাবনা নয়, এখন আলোচনায় বিনিয়োগের খরচ
এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ থাকলেও বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, ঋণনির্ভর সম্প্রসারণ এবং অর্থায়নের সংকট ছোট ও মাঝারি এআই অবকাঠামো কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ইনক্লাইন ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টেড পার্কহিল বলেন, ‘বাজার এখন এআইয়ের সম্ভাবনা থেকে এআইয়ের খরচের দিকে মনোযোগ সরাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এআই বিশ্বকে বদলে দেবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে এআই-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি শেয়ারের বর্তমান মূল্য যৌক্তিক। সামনে এই খাতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এদিকে, নাসডাক কম্পোজিট সূচক গত ৬ অক্টোবরের রেকর্ড অবস্থান থেকে প্রায় ১২ শতাংশ কমে সংশোধন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সাধারণত সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কোনো সূচক ১০ শতাংশ কমে গেলে তাকে বাজারের সংশোধন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব এশিয়ার শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। জাপানের নিক্কেই ও দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক এ বছর ২০ শতাংশের বেশি বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারের পতনের পর এসব বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে এআই খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ, ডেটা সেন্টার নির্মাণের অনুমোদন এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় এখন বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
পিএস







































