• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১

লন্ডনে প্রতারণাই যার পেশা


নিজস্ব প্রতিবেদক সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৩, ০৩:২৭ পিএম
লন্ডনে প্রতারণাই যার পেশা

ঢাকা: ৪৪ বছর বয়সী মো. জাহান কবির শিপন। যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশি। জন্ম, বাংলাদেশের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের গুণবতী এলাকার খাটরা গ্রামে। বিদেশের মাটিতে বেরিয়ে এসেছে তার একের পর এক প্রতারণার চাঞ্চল্যকর চিত্র।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট (নং-ঊক১৯২০৮৬) নিয়ে দেড় দশক ধরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্বপরিবারে (স্ত্রী-তাসরীন আহমেদ ও তিন সন্তান) পাড়ি জমান জাহান কবির শিপন। ২০০৮ সালে তিনি ইংল্যান্ড যান শিক্ষার্থী ভিসায়। এখন তিনি পরিচয় দেন ‘প্রতিষ্ঠিত বড় ব্যবসায়ী’হিসেবে। তার পরিচালনায় রয়েছে কয়েকটি রেষ্টুরেন্ট, গ্রোসারি দোকান ও কফি শপ। এসব প্রতিষ্ঠানকে তিনি নিজের দাবি করলেও অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানও নিজের নামে করেননি। সেখানকার আদালতে নিজেকে নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন ও দেউলিয়া প্রমাণ করতেই তার এ কৌশল।

প্রাপ্ত রেকর্ড মতে, জাহান কবির শিপন লন্ডনের ২২, সেডার এভিনিউর একটি ফ্ল্যাট নিজের বলে দাবি করছেন। কিন্তু রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, এটি একটি অস্থায়ী (ভাড়া) মালিকানার চুক্তি।  ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়ালেসের সঙ্গে চুক্তিটি করেছেন শারমিন ফারহানা। বাড়ির প্রকৃত মালিক নেপালি বংশোদ্ভূত অনীল গুড়াং। যে গাড়িটি ব্যবহার করেন এটিও তার নিজের নামে নয়। কিস্তিতে কেনা। জনৈক আব্দুল্লাহর কাগজপত্র দিয়ে গাড়িটি কেনেন শিপন। ব্রেক্সিটের আগে আব্দুল্লাহ ইতালি থেকে ইংল্যান্ড আসেন।

শিপনের নিজের নামে কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। ব্যবহার করেন অন্যের ক্রেডিট কার্ড। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেন সামান্যই। এসবে জমার তুলনায় উত্তোলন বেশি। তার ক্রেডিট রেটিং অত্যন্ত কম। এ কারণে আইনত তিনি নিজের নামে বাড়ি ভাড়াও করতে পারেন না। বসবাস কিংবা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য বাড়ি ভাড়া নেন অন্যের নামে। ২২ সিডার এভিনিউ, ব্ল্যাক ওয়াটার, ক্যামবারলি, সারেই (পোস্ট  কোড- জিইউ ১৭০ জেএফ ) ঠিকানাটিকে তিনি ‘নিজের বাসা’বলে দাবি করেন। এটি মূলত কুমিল্লা জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহেল বাকীর মেয়ে ডা. ফারহানা শারমিনের নামে ভাড়ায় নেয়া। জাহান কবির শিপন এই ভাড়া চুক্তির সাক্ষী মাত্র। বাড়িটির মালিক নেপাল বংশোদ্ভূত গুরং দম্পতি, মি. অনীল গুরং এবং মিসেস জিনা গুরংয়ের।

অন্যজনের সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিজের দাবি করলেও শিপনের আয়ের প্রধানতম উৎস প্রতারণা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে হাজার হাজার পাউন্ড। যা তিনি ব্যাংকিং চ্যানেল পরিহার করে দেশে পাঠান হুন্ডির মাধ্যমে।

শুধু নিজ দেশের মানুষের কাছ থেকেই নয়। অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে ইংল্যান্ডে বসবাসরত ভারত, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভেনিজুয়েলা ও রুমানিয়ার নাগরিকদের কাছ থেকেও।

শিপনের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টির প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম চন্দনাইশের মো. মোর্শেদের কাছ থেকে ১২ হাজার পাউন্ড, সিলেটের মো. মামুনের কাছ থেকে ৫ হাজার পাউন্ড, মো. কয়েশের কাছ থেকে ১৫ হাজার পাউন্ড, সিলেটের বেগম জমিলার কাছ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫ লাখ টাকা, মোসলেম মিয়ার ১৬ হাজার পাউন্ড, ফেনীর মো. সেলিমের ৫ হাজার পাউন্ড, ইংল্যান্ড প্রবাসী পিরোজপুরের জাহিদ হাসানের ১৮ হাজার পাউন্ড, চট্টগ্রামের শাহ মোহাম্মদ খান গিয়াসের কাছ থেকে ৮৫ হাজার পাউন্ড, ফেনীর জিয়ার বাংলাদেশি মুদ্রায়  ২ লাখ ৮ হাজার টাকা। জিয়ার বন্ধু ফেনীর তুহিনের ৭ লাখ টাকা, জিয়ার আরেক বন্ধু কুমিল্লার গুণবতীর মো. রুবেলের সাড়ে ১৪ লাখ টাকা্ ও চৌদ্দগ্রাম আলকরার লকিয়ত উল্ল্যাহ কাছ থেকে ৪ কোটি টাকা নানা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়েছেন শিপন।

এছাড়া ভারতের শ্রী শ্যাম ২৫ হাজার পাউন্ড, চীনের মিস্টার শিজুর ৩ হাজার পাউন্ড, পাকিস্তানের মিস উজালার ২০ হাজার পাউন্ড, বোরহানুল ইসলামের ১৮ হাজার পাউন্ড, মিস রাফিয়া ইজাজের ১৫ হাজার পাউন্ড। চীনা বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক মিসেস উইকির ৫০ হাজার পাউন্ড।  নেপালের মিস মুকুর ৩ হাজার পাউন্ড। রুমানিয়ার মিস্টার ম্যারিওর ৪ হাজার পাউন্ড। ভেনিজুয়েলার মিস্টার কার্লোসের ৫ হাজার পাউন্ড খুইয়েছেন শিপনের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে।

ভুক্তুভোগীদের অভিযোগ, ব্যবসায় অংশীদার কিংবা প্রফিট শেয়ারের কথা বলে অন্যজনের আইডি-পাসপোর্ট ব্যবহার করে ব্যবসা শুরু করেন জাহান কবির শিপন। পরবর্তীতে ব্যবসা জমে উঠলে পার্টনারের সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। কৃত্রিম ‘ঝামেলা’সৃষ্টি করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে ফেলেন। কোনো লভ্যাংশই কোনো পার্টনারকে দেন না। বিনিয়োগকৃত মূলধনও আত্মসাৎ করেন। এরপর নামেন নতুন ‘বিনিয়োগকারী’ কিংবা ‘মক্কেলের সন্ধানে।

স্বচ্ছলতা আছে-এমন কাস্টমারদের টার্গেট করে তাদের সঙ্গে প্রথমে ভাব জমান। স্থাপন করেন সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব। এক পর্যায়ে দেন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের প্রস্তাব। কৌশলে জড়িয়ে ফেলেন প্রতারণার জালে। এমন কৌশলে অর্থ আত্মসাৎ করেন যে, প্রতারিতরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারও চাইতে পারেন না। কারণ লন্ডনে অবস্থারত প্রবাসী বাংলাদেশিরা অতিরিক্ত পরিশ্রম ও কষ্টে অর্জিত পাউন্ড ইউরোপের নানা নিয়ম-কানুনের ভয়ে ব্যাংকে গচ্ছিত রাখেন না। অনেকটা বিশ্বাসের ওপর নগদে লেনদেন করেন। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন শিপন। ফলে নগদ বিনিয়োগে মানুষ প্রতারিত হলেও স্থানীয় প্রচলিত আইনে বিচার চাইতেও পারেন না।

শিপন তার রেস্টুরেন্ট এবং শপে এমন ব্যক্তিদের কাজ দেন যাদের ওয়ার্ক পারমিট কিংবা বৈধ কাগজপত্রের স্বল্পতা রয়েছে। ২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করার অনুমতি নেই-এমন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের কাজে যুক্ত করেন। তাদের মজুরিও কম দেয়। আদায় করা হয় তুলনামূলক বেশি শ্রম। এছাড়া তাদের মজুরি আটকে রাখা হয়। টাকা চাইতে গেলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়। বৈধ কাগজপত্রের অভাবে ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না।

জাহান কবির শিপন যাদের আইডি ও পাসপোর্ট ব্যবহার করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন তাদেরকে না জানিয়েই ব্যাংক থেকে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করান। যেহেতু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হয় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায়, তাই জাহান কবির কার্ডগুলো নিজের অধীনে রেখে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারেন। পরবর্তীতে যখন পাওনাদাররা টাকার জন্য আসে, ব্যাংক মামলা করে, সব অবস্থায়ই জাহান কবির আড়ালে থেকে যান। বিপদে পড়েন আইডি ও পাসপোর্ট হোল্ডার।

জাহান কবির প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ নিজের অ্যাকাউন্টে রাখেন না। যুক্তরাজ্যের আইনি সুবিধার জন্য গচ্ছিত রাখেন স্ত্রী তাসরীন আহমেদের অ্যাকাউন্টে। এ অর্থে তার স্ত্রী বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনে মজুদ করেন। বাংলাদেশেও পাঠান হুন্ডির মাধ্যমে। নিজ পরিবার, শ্বশুড়বাড়ির লোকজন ও আত্মীয় স্বজনের অ্যাকাউন্টেও পাঠান প্রতারণার অর্থ।

জাল সার্টিফিকেট ও ব্যাংক ষ্ট্যাটমেন্টেও তার প্রতারণার জাল। যুক্তরাজ্যে ষ্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়া ছাত্রদের লেখাপড়া শেষ হলে সে দেশে থাকার বিধান নেই। তবে কোনো ওয়ার্ক পারমিট দেখাতে পারলে থাকা যায়। এই ওয়ার্ক পারমিট পেতে হলে বিভিন্ন ধরনের সার্টিফিকেট লাগে। জাহান কবির শিপন ও তার স্ত্রী তাসরীন আহমেদ কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশুনা করেছেন, ফটোসপের কাজও জানেন। মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে, প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রদের ওয়ার্ক পারমিটের জন্য জাল সার্টিফিকেট তৈরী করে দিতেন শিপন ও তার স্ত্রী। কিন্তু শেষ বেলায় ওয়ার্কপারমিট না হওয়ায় অনেককেই ফেরত আসতে হয়েছে দেশে।

শিপনের এমন প্রতারণার কথা জানিয়েছেন তার এলাকার লোকজনও। মানবপাচারের অসংখ্য অভিযোগও তার বিরুদ্ধে। শিপনের বাবা স্কুল শিক্ষক মরহুম আব্দুল কাদেরের  ছাত্র চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের ডা. লকিয়ত উল্লাহ। বাবার পরিচয়ে শিপন ডা. লকিয়ত উল্ল্যার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। লন্ডনে চিকিৎসারত ক্যানসারে আক্রান্ত . লকিয়ত উল্লাহর স্ত্রীর চিকিৎসা সেবায় স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে। এরপর্ চিকিৎসা খরচের বিপুল অংকের টাকা শিপন ডা. লকিয়ত উল্ল্যার কাছ থেকে কৌশলে হাতিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে তার আসুস্থ স্ত্রীকে কক্ষের বাইরে তালা দিয়ে অন্যত্র সটকে পড়ে।

২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর শিপন দেশে আসলে, পুলিশ তার বাড়ী ঘেরাও করে হাতে নাতে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু  কৌশলে সে পালিয়ে বিদেশ পাড়ি দেয়। শিপনের বিরুদ্ধে রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অনেকে দেশের বিভিন্ন থানায় জাহান কবির শিপন, তার বড়বোন মঞ্জুয়ারা বেগমসহ তার পরিবারের কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করে। সম্প্রতি তার ভাই হুমায়ুন প্রতারনার মামলায় গ্রেফতার হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে জাহান কবির শিপনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্ট করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

জাহান কবির শিপন বারবার স্থান পরিবর্তন করে নানাভাবে তার প্রতারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের সঙ্গেও সে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। শিপনের অব্যাহত প্রতারণায় লন্ডনের স্থানীয় দফতরে একাধিক অভিযোগ জমা দেন ভুক্তভোগীরা।  এরপর লন্ডন পুলিশ জাহান কবির শিপনের পায়ে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। সে এখন দেশী বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে। ভুক্তভোগীরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

এমএস
 

Wordbridge School
Link copied!