• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
Sonalinews.com

যুবকের ইবাদত আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়


মিনহাজ উদ্দিন অক্টোবর ২৪, ২০২০, ০৪:১৫ পিএম
যুবকের ইবাদত আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়

ঢাকা : পৃথিবীর সবকিছুই যুবকদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখে।  যুবকদের তালে তালে দুনিয়ার রঙ বদলায়। যুবকরাই পারে সুন্দর একটা পৃথিবী উপহার দিতে। আর আল্লাহতায়ালাও যুবকদের ইবাদত বেশি পছন্দ করেন। এ কারণে যৌবনের ইবাদতের ব্যাপারে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে প্রত্যেকের। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রত্যেক যুবককে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করবেন। একজন বান্দার দুই পা ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের জায়গা থেকে নড়বে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে চারটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়- এক. তার জীবন সম্পর্কে এবং জীবনের প্রতি সে কেমন ব্যবহার করেছে। দুই. তার যৌবনাবস্থা সম্পর্কে এবং কীভাবে কোন পথে তা ব্যয় করেছে? তিন. তার জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করেছে কি না।  চার. সে কোন পথে অর্থোপার্জন করেছে এবং কোন পথে তা ব্যয় করেছে?

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এরপরও তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্বিতীয় প্রশ্নটি করবেন আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো তার যৌবনাবস্থা সম্পর্কে। যদিও যৌবনকাল জীবনেরই একটি অংশ, তারপরও আল্লাহতায়ালা যৌবনাবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। আল্লাহতায়ালা কি কোনো চিন্তাভাবনা, কোনো যুক্তি, কোনো কারণ ছাড়াই অনেক কিছুর মধ্যে যৌবনাবস্থাকে প্রশ্ন করার বিষয় সম্পর্কে বেছে নিলেন?

“আল্লাহ তিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তিদান করেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। [সুরা রূম : ৫৪]

অবশ্যই তোমরা এমন এক বয়সে উপনীত হয়েছো যে বয়সে শয়তান পড়াশোনা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অবিরাম আশা গঠনের মাধ্যমে তোমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যদি তোমাদের বলা হয় সেই মহান রাজাধিরাজ আল্লাহকে ডাকো অথবা আল্লাহর পথে কিছুটা সময় ব্যয় কর। শয়তান তখন এই বলে তোমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে যে, ‘এখনই এমনটি করবে? তুমি এখন স্কুলে, কিছুদিন পর তুমি তোমার ডিগ্রি অর্জন করবে- সমাজে সম্মান বাড়বে তুমি তখন আল্লাহতায়ালার জন্য ভালো কাজ করতে পারবে।’

এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম কথা হলো, তোমরা জানো না কবে তোমরা ডিগ্রি অর্জন করবে এবং তোমরা জানো না কবে তোমরা মারা যাবে এবং তোমরা জানো না কী অবস্থায় আল্লাহর সামনে তোমাকে দাঁড়াতে হবে (আখিরাতে)। এ কারণে এমন আকাশ কুসুম কল্পনা থেকে নিজেদের বিরত রাখো।

দ্বিতীয়ত তোমরা যদি এই বয়সেই আল্লাহর পথে সময় ব্যয় করার ব্যাপারে কৃপণ বা কঞ্জুস হও, তাহলে ভবিষ্যতে যে সময় আসছে সেই সময় তুমি আরো কঞ্জুস অথবা কৃপণে পরিণত হবে। প্রকৃতপক্ষে, যৌবন বয়সে যে ব্যক্তি নিজেকে ইসলামের রঙে রঙিন করেছে আর যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে ইসলামে প্রবেশ করেছে এই দুজনের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান। আসলেই এই দুজনের মধ্যে বিদ্যমান কত বিশাল পার্থক্য! এর মূল কারণ হলো, এই বয়স থেকে ইসলামের নিয়মকানুন পালন করা অনেক সহজ। তুমি যদি যৌবনাবস্থায় ইসলামকে তোমার জীবনের একটি অংশ ধরে নাও, তাহলে তোমার অঙ্গ, প্রত্যঙ্গ, দেহ, শরীর, আত্মা তথা সমগ্র জীবনই ইসলামের একটি অংশ হয়ে দাঁড়াবে। বাস্তবে, তুমি ইসলামের একটি অংশে রূপান্তরিত হবে। একটি কচি গাছ এবং বড় বৃক্ষ দ্বারা উদাহরণ দিলে এটি আরো স্পষ্ট হবে। বড় বৃক্ষে প্রতিষ্ঠিত কাণ্ড, গুঁড়ি এবং শুকিয়ে যাওয়া বাকল বিদ্যমান। এ কারণে বড় বৃক্ষের শাখা-প্রশাখাগুলো যেসব দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে- সেসব দিক থেকে ওই শাখা-প্রশাখাগুলোর দিক পরিবর্তন কষ্টসাধ্য। অপরপক্ষে, ছোট বৃক্ষের দিক সহজেই পরিবর্তনসাধ্য। কেননা হাত দিয়ে নিজের সুবিধামতো একে পরিবর্তন করা যায়।

উপরোল্লিখিত কারণে বিশ্বজাহানের রব মহান আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সেইসব যুবককে যারা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তাদেরকে কিয়ামতের দিন ছায়া প্রদান করবেন, যখন অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। সেদিন (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। সেদিন আল্লাহতায়ালা সাত ব্যক্তিকে তার আরশের নিচে ছায়া প্রদান করবেন- ‘একজন যুবক, যে আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করা অবস্থায় বেড়ে উঠেছে।’

আল্লাহতায়ালা যেমনভাবে ইসলাম নাজিল করেছেন, যে আইনকানুন দিয়েছেন তা সম্পর্কে অবহিত হওয়াও এমন ব্যক্তির জন্য সহজ নয়। এরপরও জাহেলি যুগের যেসব রীতিনীতিকে ইসলাম শিকড়সহ উপড়ে ফেলেছে সেসব রীতিনীতিই হয়তো তার জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। উদাহরণস্বরূপ তার স্ত্রী বিভিন্ন পার্টিতে নাচগান করতে অভ্যস্ত, তার মেয়েছেলেদের সাথে বেড়াতে অভ্যস্ত, তার আত্মীয়-স্বজন তার সামনে মদপানে অভ্যস্ত, তার অপর কন্যা তার বাড়িতে আগত পুরুষ অতিথিদের সাথে করমর্দন করে, তার বোন অতিথিদের সাদরে আমন্ত্রণ জানানোর পর তাদের সামনে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে বসে থাকে, তাদের সাথে চা-কফি পান করে। এই সবগুলো অবশ্যই পরিবর্তন করা দরকার, যদি সে ইসলামী জীবনধারায় নিজের জীবনকে অতিবাহিত করতে চায়। তাহলে দ্বীনানুসারে উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আনা তার পক্ষে দুরূহ ব্যাপার হবে। তাকে অনেক কষ্টকর-অসন্তোষজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।

এটাই হলো তরুণ বয়সে সে যদি ইসলামী দাওয়ায় প্রবেশ করত, ইসলামকে জানত-চিনত, তার সাথে বর্তমানে বৃদ্ধাবস্থায় ইসলাম গ্রহণের বিশাল পার্থক্য। সে যদি তরুণ বয়সে ইসলাম কবুল করত, তাহলে এখন এমন কষ্টকর সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো না। তরুণ অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ না করায় তাকে অনেক কষ্ট পেতে হচ্ছে। কিন্তু সে যদি তরুণাবস্থাতেই ইসলাম গ্রহণ করত, তাহলে সে সত্যিকার মুসলিম মেয়ে ছাড়া বিয়ে করত না; যেহেতু সে একজন মুসলিম। তাই ইসলামই হবে তার বিয়ের জন্য মুখ্য শর্ত। অপরপক্ষে যে ব্যক্তি তার জীবনের অধিকাংশ সময় ইসলামী জীবনধারায় কাটায়নি, সে ব্যক্তি এমন মেয়ে খুঁজতে পারে, যে মেয়ের প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে অথবা সে কোনো রাজকন্যা; কোনো মন্ত্রীর মেয়ে কিংবা কোনো ধনীর দুলালী। ওই ব্যক্তি এমন মেয়েকে বিয়ে করবে এই কারণে, যাতে সে ওই মেয়েকে অবলম্বন করে সমাজে উন্নতি লাভের সিঁড়িতে আরোহণ করতে পারে। ওই ছেলে-মেয়ের পরিবারের কথা লোকজনের সাথে বলে বেড়ায়, ‘আমি এখন অমুক মন্ত্রীর সাথে সংশ্লিষ্ট, আমি এখন তার পরিবারের অংশ।’ এসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে যখন সে ইসলাম নামক মহাপরীক্ষার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন তার কাছে ইসলাম অনেকটা মহাসংকটের মতো কঠোর মনে হয়। তাহলে সুদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি কি সে চালাতে পারবে? সে ওই জমির ব্যাপারে কী করবে যা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনা? সেই সব দুনিয়াবি বন্ধু যারা ওই জমি নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সে কী করবে? এসব বিষয়ে তার আচরণ কেমন হবে? এগুলো থেকে কি সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে, সে কি তার সঙ্গী-সাথীদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে, সে কি নাইট পার্টি এবং নাচানাচি বন্ধ করে দেবে, সে কি পারবে সব খারাপ কিছু শেষ করতে? একজন ব্যক্তির পক্ষে একবারে সব খারাবিকে উৎখাত করে এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া সহজ ব্যাপার নয়।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ সময় হলো যৌবন। অন্তর এবং সময়ের অপব্যয়ের কারণে সব পাপ কাজ সংঘটিত হয়। অন্তরের অপচয় তখনই ঘটে যখন দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের জীবনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর অসংখ্য আকাশ কুসুম কল্পনা মানুষের অন্তরে দানা বাঁধলে সময়ের অপব্যয় ঘটে। নিজের অন্তরকে অনুসরণ করাই হলো শয়তানি কর্মের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

সত্যপথের অনুসরণ করা এবং আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার জন্য প্রস্তুতি হলো সব সৎকর্মের ভিত্তি : ‘যে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দেয় জাহান্নামই হবে তার আবাস। পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ (সুরা নাজিয়াত : ৩৭-৪১)

Side banner