ফাইল ছবি
মাস শেষে ব্যাংকের হিসাব বিবরণীতে যোগ হওয়া মুনাফার অঙ্কের দিকে তাকিয়ে হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ কিংবা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট বা এফডিআরের এই আয় দিয়েই অনেকে মেটান সংসারের নানা খরচ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা বয়স্ক মা-বাবার ওষুধের জোগান। কিন্তু এই মুনাফা কি আদৌ শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হালাল?
প্রচলিত ব্যাংক কিংবা ইসলামি ব্যাংকের লভ্যাংশ ভোগ করে সংসার চালানো কি জায়েজ-এমন প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খায় ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে। সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণামূলক ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকার দেওয়া এক সুনির্দিষ্ট ফতোয়া এই দীর্ঘদিনের দ্বিধাদ্বন্দ্বকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
ইসলামী আইন ও ফিকহ শাস্ত্রের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহকের জমাকৃত অর্থকে আপাতদৃষ্টিতে ‘আমানত’ বা আমানতি বলা হলেও শরীয়তের পরিভাষায় তা মূলত ‘ঋণ’ বা ‘করজ’ হিসেবে গণ্য হয়। কারণ, ঋণের মূল শর্ত হলো গ্রহীতা তা ফেরত দিতে বাধ্য থাকে, যা ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সত্য। তাছাড়া ব্যাংকগুলো সেই আমানত হুবহু সংরক্ষণ না করে বিভিন্ন লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে।
প্রচলিত সুদি ব্যাংকের সেভিংস বা ফিক্সড ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট থেকে যে লভ্যাংশ বা মুনাফা দেওয়া হয়, তা সরাসরি সুদের অন্তর্ভুক্ত এবং কুরআন-সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী তা স্পষ্টতই হারাম। এমনকি মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পাওয়া লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও একই ধর্মীয় বিধান প্রযোজ্য।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে দেশের তথাকথিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম নিয়ে। মারকাযুদ দাওয়াহর ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কাগজে-কলমে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ব্যানার টাঙানো হলেও বাস্তবে এসব ব্যাংক তাদের বিনিয়োগে যথাযথভাবে শরীয়ার নীতিমালা অনুসরণ করে না। তাদের বিনিয়োগ এবং গ্রাহক লেনদেনের বড় একটি অংশই শরীয়তসম্মত উপায়ে সম্পাদিত হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইসলামি ব্যাংকের দেউলিয়াত্বের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার ঘটনাকেও তাদের এই ত্রুটিপূর্ণ ও অনিয়মিত কারবারের বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে এসব ব্যাংকের ডিপিএস বা এফডিআর থেকে প্রাপ্ত মুনাফাও ভোগ করার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে ফতোয়া বোর্ড।
তবে দৈনন্দিন লেনদেন বা নিরাপত্তার প্রয়োজনে ব্যাংকিং সেবার সম্পূর্ণ পথ বন্ধ নয়। কোনো ধরনের সুদ বা লভ্যাংশ না থাকলে এবং কেবল সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য হলে প্রচলিত বা ইসলামি ব্যাংকের ‘কারেন্ট অ্যাকাউন্ট’ বা চলতি হিসাব ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংকের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা বেশি উত্তম বলে মত দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকের লকার সেবায় মূল্যবান সামগ্রী রাখা সম্পূর্ণ বৈধ, কারণ তা শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রকৃত আমানত হিসেবে বিবেচিত হয়।
অজ্ঞানতাবশত বা না জেনেই যারা এতদিন সুদি বা অষরীয়তসম্মত অ্যাকাউন্টে টাকা রেখে সেখান থেকে আসা মুনাফায় সংসার চালিয়েছেন, তাদের জন্যও রয়েছে করণীয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা। এ ক্ষেত্রে দ্রুত অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে মূল টাকা তুলে নিতে হবে, যা মালিক নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে সুদ বা লভ্যাংশ হিসেবে আসা অতিরিক্ত অর্থ সওয়াবের কোনো নিয়ত ছাড়াই তুলে নিয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে সদকা করে দেওয়াই একমাত্র নিরাপদ পথ। ব্যাংকের লভ্যাংশ দিয়ে সংসার পরিচালনার এই চাকা কতটা শরীয়তসম্মত, তা নিয়ে ফতোয়া ও ধর্মীয় অনুশাসনের এই কড়াকড়ি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
এসএইচ







































