• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

কুঁচিয়া, কচ্ছপ শিকারেই বাঁচে আদিবাসীদের জীবন


আলমাস আলী, ঈশ্বরদী  মার্চ ১৫, ২০২৩, ০২:৩৪ পিএম
কুঁচিয়া, কচ্ছপ শিকারেই বাঁচে আদিবাসীদের জীবন

ঈশ্বরদী: চারিদিকে শুনসান নিরবতা। বাড়ি বাড়ি ঘুরেও কোন নারী বা পুরুষের দেখা মেলা ভার। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গ্রামের কেউ গেছে জঙ্গলে পশু পাখি শিকারে। কেউ গেছেন খাল-বিলে কুঁচিয়া কিংবা কচ্ছপ ধরতে। আবার কেউ গেছেন মাঠে কৃষি শ্রমিকের কাজে। ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নের মাড়মি আদিবাসী পল্লীতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। 

এ অঞ্চলের আদিবাসীরা এখনো অবহেলিত। এদের জীবনও চলে তাদের নিজস্ব নিয়মে। বনে বাদাড়ের পশু, খাল বিলের কুচিয়া, কচ্ছপ শিকার ও মাঠে কৃষি শ্রমিকের কাজ করেই যাদের জোটে দু’বেলা আহার। এখনো এই গ্রামের পথ-ঘাট কাঁচা মেঠোপথ। প্রায় সবার বাড়িঘর মাটির।

পাবনার ঈশ্বরদীর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসী মানুষের অন্যতম পেশা কুঁচিয়া শিকার ও বিক্রি। কুঁচিয়া শিকারি আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের প্রধান পেশা ছিল পশু শিকার। পাশাপাশি তারা ভুট্টার চাষ করতেন। ভুট্টার ভাত, বুনো শূকর ও খরগোশের মাংস ছিল তাদের নিত্যদিনের খাবার। বন-জঙ্গলে এসব প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় পশু শিকার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে সবাই পেশা বদল করেছেন। কৃষিজমিতে দিনমজুরের কাজ এখন তাদের প্রধান পেশা। পাশাপাশি কুঁচিয়া ও কচ্ছপ শিকার করে এদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করছেন। 

এসব কুঁচিয়া বেচাকেনার জন্য উপজেলার কালিকাপুর বাজারে গড়ে উঠেছে একটি আড়ত। সেখান থেকে সপ্তাহে দুদিন ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে চীন, থাইল্যান্ড, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয় এ কুঁচিয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  ঈশ্বরদীতে জলাশয়ে কচ্ছপও খুব একটা না থাকায় এটিও এখন বিলুপ্তির পথে। এখন শুধু কুঁচিয়া শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছে আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৩৫-৪০টি পরিবার। অন্য পরিবারগুলো সবাই কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল।

আঞ্চলিকতা ভেদে কুঁচিয়া ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। কুঁচে, কুইচ্ছা, কুঁচে বাইম, কুঁচিয়া ও কঁচুয়া নামের পাশাপাশি ‘কুঁচি মাছ’ নামেও এদের অনেকেই চেনেন। তবে এটি একটি ইল-প্রজাতির মাছ। সাপের মতো দেখতে এ মাছ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য অনেকে কুঁচিয়া খান। একটি কুঁচিয়ার সর্বোচ্চ দেড় থেকে দুই কেজি পর্যন্ত ওজন হয়। একজন শিকারি দিনে দুই থেকে আট কেজি পর্যন্ত কুঁচিয়া শিকার করতে পারেন। নভেম্বর থেকে জুন মাস পযন্ত কুঁচিয়া ধরার উপযুক্ত মৌসুম।

উপজেলার মারমী গ্রামের আদিবাসী ফাবিয়ান বিশ্বাস সোনালীনিউজকে বলেন, ‘১০ বছর কুঁচিয়া শিকার করছি। আগে নিজেরা খাওয়ার জন্য ধরতাম। এখন এটা পেশা হয়ে গেছে। কপাল ভালো হলে কোনো কোনো দিন ৭-৮ কেজি পর্যন্ত কুঁচিয়া ধরতে পারি।’

কুঁচিয়ার বাজার দর কেমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কুঁচিয়ার বাজারদর সব সময় এক থাকে না। প্রতি কেজি ১৬০-২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। এখন ২০০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যায় না।’

কুঁচিয়া শিকারি আদিবাসী জ্যাকব বিশ্বাস বলেন, ‘বাপ-দাদারা বুনো শূকর, খরগোশ, বনবিড়াল, কচ্ছপ শিকার করতো। এখন জঙ্গল নাই। এসব শিকারও করতে পারি না। এখন শুধু কুঁচিয়া মাছ শিকার করি। তবে যেভাবে কারেন্ট জালের ব্যবহার বেড়েছে তাতে এটাও হয়তো একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাচ্চা কুঁচিয়া কারেন্ট জালে আটকে মারা যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বছরে ৭-৮ মাস কুঁচিয়া শিকার করা যায়। অন্য চারমাস বসে কাটাতে হয়। অথবা কোনো কাজ খুঁজে নিতে হয়। কুঁচিয়া শিকার করে কোনোরকমে দিন কেটে যাচ্ছে। মাসে গড়ে ১২-১৫ হাজার টাকা আয় হয়।’

কথা হয় কুঁচিয়ার আড়তদার বার্নাট দাসের সঙ্গে। তিনি সোনালীনিউজকে বলেন, ‘আমিও একসময় কুঁচিয়া শিকারি ছিলাম। পরে নিজেই আড়ত দিয়েছি। এখানে ৩০-৩৫ জন শিকারি আছেন। তারা মাসে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কেজি কুঁচিয়া শিকার করতে পারেন। এসব কুঁচিয়া ঢাকার উত্তরায় চলে যায়। সেখান থেকে এসব কুঁচিয়া মৎস্য অফিসের সহযোগিতায় চীন, জাপান ও থাইল্যান্ড রপ্তানি করা হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুর রহমান খান সোনালীনিউজকে বলেন, কুঁচিয়া শিকারিরা এখন পর্যন্ত মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করেননি। বাণিজ্যিকভাবে চাষের বিষয়টিও তাদের কেউ জানাননি। কেউ এ বিষয়ে আগ্রহী হলে তাকে উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে সহযোগিতা করা হবে। 

সোনালীনিউজ/এম

Link copied!