• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

দুর্নীতির অভিযোগের মাঝেই দায়িত্বে ফিরলেন ড. নাসরিন


মো. শাকিল শেখ, সাভার প্রতিনিধি মার্চ ৫, ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
দুর্নীতির অভিযোগের মাঝেই দায়িত্বে ফিরলেন ড. নাসরিন

ছবি: প্রতিনিধি

ঢাকার সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এ নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম ও গবেষণা বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সাবেক পরিচালক (গবেষণা) (রুটিন দায়িত্ব) ও বাঘাবাড়ী সিরাজগঞ্জের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানার সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে তিনি পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জানা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এক অফিস আদেশে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পর ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে আরেক আদেশে তার সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই দিনটি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবেরের চাকরি জীবনের শেষ কর্মদিবস ছিল। তবে ড.নাসরিন সুলতানার সাময়িক বহিষ্কার প্রত্যাহারের পিছনে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

বিএলআরআই এর সিএসও ড. নাসরিন সুলতানা বিগত ২০০২ সালে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে বিএলআরআই-এ যোগদান করেন। একই সময়ে বিএলআরআই এর আরো অনেকেই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করলেও ড. নাসরিন সুরতানা তার স্বামী আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত বিএলআরআই এর সাবেক মহাপরিচালক ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এর প্রভাব খাটিয়ে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সমর্থক হিসেবে ২০২১ সালেই সিএসও হিসেবে পদোন্নতি পান। 

শুধু তাই নয় ড. নাসরিন সুলতানা, পরিচালক (গবেষণা) (রুটিন দায়িত্ব) এর দায়িত্ব পালনকালে প্রতি বছর পরিচালক গবেষণা এর দপ্তরের নামে গবেষণা প্রকল্পের নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বাজেটের প্রায় এক পঞ্চমাংশ নিজের নামে নিয়ে গবেষণার অর্থ লুটপাট করেছেন, যা বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন প্রত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। 

এছাড়াও, বিএলআরআই-এ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা অর্থ লেনদেনের সাথেও জড়িত ছিলেন। নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়গুলো বিগত সময়ে বিভিন্ন প্রত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সমর্থক হওয়ায় ড. নাসরিন সুলতানার বিষয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিজেকে আওয়ামীলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এছাড়াও, সরকারী জ্বালানী ব্যবহার করে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণের দায়িত্বও পালন করেন।

নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়োগে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় ছিল এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন মহাপরিচালক ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে বলেও জানা যায়।

ইনস্টিটিউটের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ২০২১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে গবেষণা বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার আউটপুট নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান না হলেও বরাদ্দ ব্যয়ের তথ্য দেখানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।

প্রশাসনিক আদেশে ১২ নভেম্বর ২০২৪ তারিখের অফিস আদেশে পরিচালক (গবেষণা) (রু.দা.) বাতিল হওয়ার পরও পরিচালক পদে স্বাক্ষর করেন এবং নিজ কর্মস্থলে যোগদান না করে রুটিন দায়িত্বে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন ইনস্টিটিউটের শৃঙ্খলা ও কর্ম পরিবেশ নষ্টের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক তদন্তে ড. নাসরিন সুলতানার বিরুদ্ধে চাকুরিতে অসদাচরণ, নিয়োগ বাণিজ্য, ইনস্টিটিউটের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ প্রতীয়মান বলে দাবি করা হলেও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তদন্ত প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকতে পারে।

দুদকে মামলা প্রক্রিয়াধীন,তৎকালীন মহাপরিচালক ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিটি নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার আগেই মন্ত্রণালয় এবং সংস্থার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট নিয়োগ বাণিজ্য করতে মাঠে তৎপর হয়। ঐ সিন্ডিকেট চাকরি প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করার সাথে সাথে প্রার্থীদের চাকরি নিশ্চিত করতে তাদের কাছে ঘুষ দাবি করে।

বিজ্ঞানী কমিউনিটির গ্রুপে একজন বিজ্ঞানী অভিযোগ করে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে নিজের অভিমত তুলে ধরে বলেন,'মাস্টার্স করে বিএলআরআইতে ভাইভাতে টেকার পরেও আমাকে বাদ দিয়েছিল। আর পিএইচডি’র পরে বলেছিলো, সবার ১৫ লাখ, তোমার ৫ লাখেই হবে, যেহেতু পিএইচডি আছে।

একই গ্রুপে আরেকজন বিজ্ঞানী জানান, '৩২ লাখ লাস্ট রেট ছিল।' অপরজনের মন্তব্য, 'আমি যদিও অন্য ফ্যাকাল্টির এক হাজবেন্ড্রির বড় ভাই বলেছিলেন প্রিলি ছাড়া ফরেন ক্যাডার হওয়া সম্ভব কিন্তু টাকা ছাড়া বিএলআরআইয়ে চাকরি অসম্ভব।' অন্য একজন বলেন, 'এত অযোগ্য দিয়ে একটা রিসার্চ ইনস্টিটিউট চলে, হাসি পায়।'

বিজ্ঞানীদের এমন হাজারো অভিযোগ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) প্রতিষ্ঠানটির সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনকে নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত এ মহাপরিচালক ও তাঁর স্ত্রী ড. নাসরিন সুলতানা বিএলআরআইকে নিজের নানা অপকর্মের আখড়া হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

সিন্ডিকেটের এরুপ একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের ছাগল উন্নয়ন গবেষণা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা লিপি রাণী সরকার তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও একই নম্বরের হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করে একাধিক চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে ঘুষ লেনদেনের আলাপ করেন। আলাপকালে তিনি প্রার্থীদের একজনকে বলেন, বিএলআরআই'র মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর হোসেনের স্ত্রী নাসরিন সুলতানা এবং তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক জিল্লুর রহমান নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করবেন। চাহিদা মতো ঘুষের অঙ্ক নিশ্চিত হলে মহাপরিচালকের স্ত্রী নিজেই এ বিষয়ে কথা বলবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চাকরিপ্রত্যাশী একাধিক ভুক্তভোগী জানান, লিপি রানী সরকারসহ কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে মহাপরিচালকের স্ত্রী ড.নাসরিন সুলতানা চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে শত কোটি টাকারও বেশি আদায় করে তাদের চাকরি নিশ্চিত করছেন। ভুক্তভোগীরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবকেও ফোন করে অভিযোগ করেন। নিয়োগ বাণিজ্য এবং দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী ছিলেন মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তারা নিয়োগ কমিটির সদস্য না হলেও মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে বাণিজ্যর সফল বাস্তবায়নের জন্য পরীক্ষার আগের দিনই বিএলআরআই'র ক্যাম্পাসে চলে যেতেন এবং প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র প্রণয়নসহ সকল কার্যক্রম সশরীরে উপস্থিত থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

এ ব্যাপারে ড. নাসরিন সুলতানার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিএলআরআই কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত সংক্রান্ত বিষয় মন্ত্রণালয় দেখছে।

এসএইচ 

Wordbridge School
Link copied!