• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

রামেকে কোটি টাকার অক্সিজেন প্ল্যান্ট অচল


রাজশাহী প্রতিনিধি জুলাই ৯, ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
রামেকে কোটি টাকার অক্সিজেন প্ল্যান্ট অচল

ছবি : প্রতিনিধি

রাজশাহী: করোনা মহামারির ভয়াবহ সময়ে জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থাপন করা হয়েছিল অত্যাধুনিক অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট। প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্ল্যান্ট থেকে হাসপাতালের নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্বল্প খরচে বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু চালুর মাত্র ১১ মাসের মাথায় সেটি বিকল হয়ে পড়ে। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। এখনও অচল অবস্থায় পড়ে আছে প্ল্যান্টটি। ফলে কোটি টাকার এই সরকারি বিনিয়োগ কোনো কাজে আসছে না, উল্টো হাসপাতালকে প্রতি মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে তরল অক্সিজেন কিনতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, করোনা পরিস্থিতিতে গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) ২০২১-২২ অর্থবছরে রামেক হাসপাতালে পিএসএ (Pressure Swing Adsorption) প্রযুক্তির অক্সিজেন জেনারেটর প্ল্যান্ট স্থাপন করে। ঢাকার আনিফকো হেলথকেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্ল্যান্টটি সরবরাহ ও স্থাপনের দায়িত্ব পায়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য তারা কোনো চাহিদাপত্র পাঠায়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্ল্যান্টটি বসানোর সময় প্রয়োজনীয় জেনারেটর, দক্ষ অপারেটর কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে শুরু থেকেই পরিচালনায় নানা জটিলতা দেখা দেয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যেত এবং পুনরায় চালু করতে প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হতো।

হাসপাতালে আগে থেকেই ভ্যাকুয়াম ইনসুলেশন (ভিআই) ট্যাঙ্কের মাধ্যমে তরল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু ছিল। নতুন প্ল্যান্টের উৎপাদিত অক্সিজেন সেই লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত কারণে তাতে সম্মতি দেয়নি। পরে পরীক্ষামূলকভাবে হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে প্ল্যান্টটির সংযোগ দেওয়া হয় এবং এর জন্য পৃথক একটি কক্ষও নির্মাণ করা হয়।

কিন্তু চালুর মাত্র ১১ মাস পর, ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট থেকে প্ল্যান্টটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এরপর একাধিকবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও স্থায়ীভাবে এটি সচল করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েকবার পরিদর্শন করে মেরামতের আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

এদিকে, অচল প্ল্যান্টের কারণে হাসপাতালকে প্রতিনিয়ত তরল অক্সিজেনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্ল্যান্টটি সচল থাকলে এই ব্যয়ের বড় একটি অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব হতো।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগও বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিশ্বস্বাস্থ্য-২ শাখা থেকে রামেক হাসপাতালের পরিচালককে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে স্থাপিত পিএসএ/ভিএসএ অক্সিজেন প্ল্যান্টগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য ইউনাইটেড ন্যাশনস অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেস (ইউএনওপিএস)-বাংলাদেশ একটি টেকনিক্যাল টিম গঠন করেছে। পরিদর্শনের সময় প্ল্যান্টের অপারেশনাল তথ্য, রক্ষণাবেক্ষণ নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে প্ল্যান্টটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সিএমএসডিকে জানানো হয়েছে যে প্ল্যান্টটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল সভাতেও বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা এখন পর্যন্ত প্ল্যান্টটি মেরামত করেনি।

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা শুধু অর্থের অপচয় নয়, এটি পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। যে প্ল্যান্টটি হাসপাতালের অক্সিজেন ব্যয় কমানোর কথা ছিল, সেটিই আজ পরিণত হয়েছে অব্যবহৃত সম্পদে। ফলে প্রকল্পটির দায়-দায়িত্ব নিরূপণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত প্ল্যান্টটি সচল করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

পিএস

Link copied!