পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসায় কোরবানির পশু কিনতে দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে ভিড় বাড়বে। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা গরুসহ নানা ধরনের গবাদিপশু ক্রয় করবেন। কিন্তু এই সময়কে ঘিরে কিছু অসাধু খামারি ও ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজাকরণের অপচেষ্টায় জড়িয়ে পড়েন। দ্রুত পশুর ওজন বাড়ানোর জন্য তারা নিষিদ্ধ স্টেরয়েড, গ্রোথ হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটারসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করেন। এতে একদিকে পশুর স্বাভাবিক স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে এসব পশুর মাংস মানুষের জন্যও নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
কোরবানির পশু কেনার সময় কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু চেনার উপায় এবং প্রাকৃতিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া।
তিনি বলেন, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর নাক সাধারণত শুকনো থাকে। এসব গরুর শরীর থলথলে হয় এবং দেহে অতিরিক্ত পানি জমে থাকে। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। গরুগুলোকে ক্লান্ত ও অলস দেখায়, অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়।
অধ্যাপক আলম মিয়া জানান, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর শরীরে হাত দিলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কম দেখা যায়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে শরীরের অংশ দেবে যায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। এসব গরুর রানের মাংস অস্বাভাবিক নরম হয় এবং হাড়ও তুলনামূলক দুর্বল থাকে। ফলে দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
তিনি আরও বলেন, এসব গরুর খাওয়ার আগ্রহ কম থাকে এবং নিয়মিত জাবর কাটে না। অনেক সময় মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা বা ফেনা বের হতে দেখা যায়। দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে হাটে আনার পর তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বসে গেলে সহজে উঠতে চায় না।
সুস্থ গরু চেনার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, সুস্থ গরুর নাক ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকবে, চোখ উজ্জ্বল থাকবে এবং শরীরে হাত দিলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। সুস্থ গরু চঞ্চল স্বভাবের হয়, খাবার দেখলে খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং নিয়মিত জাবর কাটে। এছাড়া সুস্থ গরুর চামড়া টানটান ও চকচকে থাকে।
তিনি জানান, গরুর শরীরে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে যদি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে সেটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা হওয়ার লক্ষণ। অন্যদিকে চাপ দেওয়ার পর দেবে থাকলে বুঝতে হবে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমেছে।
হাটে অনেক সময় পশুটি অসুস্থ নাকি সুস্থ এটি নির্ণয় নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দ্বিধা তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে সহজে কিছু চেনার উপায় জানিয়েছেন অধ্যাপক আলম মিয়া।
তিনি যোগ করেন, যদি তাপমাত্রার কথাই ধরি, তাহলে পশুর তাপমাত্রা মানুষের মতো মাপা যায় না, পশুর ক্ষেত্রে রেকটাল টেম্পারেচার (মলাশয়ের তাপমাত্রা) নিতে হয়। কিন্তু কেনার সময় তা করা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে পশুর কানের গোড়ায় হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায় সহজেই। এছাড়া আরেকটি সহজ উপায় হলো গরুর নাকের উপরের অংশে (মাজল) হাত দিলে স্থানটি যদি শুকনা মনে হয় তাহলে ধরে নিতে হবে গরুটি অসুস্থ।
খামারিদের উদ্দেশে ড. আলম মিয়া বলেন, অনেক খামারি হাতুড়ে চিকিৎসক বা কোয়াকদের পরামর্শে ডেক্সামেথাসন, প্রেডনিসোলনসহ বিভিন্ন স্টেরয়েড ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করেন। এসব ওষুধ পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ পশুর মৃত্যুও ঘটতে পারে। প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে খুব সহজেই গরু মোটাতাজা করা সম্ভব। এজন্য ২ থেকে ৪ বছর বয়সী স্বাস্থ্যবান গরু নির্বাচন, নিয়মিত কৃমিনাশক প্রয়োগ, সুষম খাদ্য সরবরাহ, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স ব্যবহার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক ব্যবস্থাপনায় ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই একটি গরু ভালোভাবে মোটাতাজা করা সম্ভব।
সবশেষে তিনি কোরবানির পশু কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুধু পশুর আকার-আকৃতি দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তার স্বাভাবিক আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, নাকের অবস্থা ও চলাফেরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পশুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে কোনো সন্দেহ দেখা দিলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এম







































