• ঢাকা
  • শনিবার, ২১ মে, ২০২২, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
নিরাপদ খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনে ডিএই’র প্রকল্প সহায়তা

অর্থনৈতিক উন্নয়নে খেজুর চাষ


ড. মো. আখতারুজ্জামান ডিসেম্বর ২২, ২০২১, ১১:৪৪ এএম
অর্থনৈতিক উন্নয়নে খেজুর চাষ

ঢাকা : খেজুরের গুড় ও খেজুর রসের মৌসুম শীতকাল, এটা আমাদের সবারই জানা। তবে গাছ কেটে কীভাবে গুড় তৈরি করা হয়, তা হয়তো শহুরে মানুষদের অনেকের কাছেই অজানা। কোমরে দড়ি বেঁধে ধারালো হাসুয়া দিয়ে গাছ কেটে সেখান থেকে যারা রস সংগ্রহ করেন তারা হলেন গাছি। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে খেজুরের গাছ কাটা হয়। অর্থাৎ গাছের মাথার দিকের এক পাশের ছাল-বাকল তুলে ফেলা হয়। এরপর কয়েক দিনে ছাল তোলা অংশটি শুকায়। অগ্রহায়ণের শেষে খেজুর গাছের

ছাল তোলা অংশ চেঁছে ওপরের দিকে দুটি চোখ কাটা হয়। নিচের দিকে বাঁশের তৈরি নল পোঁতা হয়। এই নল দিয়েই ফোঁটায় ফোঁটায় রস গাছে ঝোলানো মাটির হাঁড়িতে জমা হয়। প্রথম কাটের রস দিয়ে তৈরি করা হয় নলেন গুড়। নলেন গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি। নলেন গুড় দিয়েই তৈরি হয় সুস্বাদু সন্দেশ, প্যাড়া-সন্দেশ, ক্ষীর-পায়েসসহ অনেক ধরনের খাবার। আবার শীতার্ত সকালে কুয়াশার চাদরে মুড়ে খেজুর গাছ থেকে সদ্য আহরিত খেজুরের রস খাওয়ারও একটা অন্য রকমের মজা রয়েছে। তবে খেজুর গাছের রস সংগ্রহে পরিমিত ব্যবস্থা না থাকার কারণে খেজুর রসে বাদুড় থেকে নিপা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার আশংকায় এখন সচেতন মানুষ আর সেভাবে খেজুর রস পান করতে চান না। খেজুরের গুড়ের ক্ষেত্রে সবার আগে দেশের যে অঞ্চলের নাম আসে, তার মধ্যে রয়েছে যশোর ও কুষ্টিয়া। ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ বইয়ের তথ্যানুসারে ১৯০০-১৯০১ সালে পূর্ববঙ্গে খেজুরের গুড় তৈরি হয়েছে প্রায় ৮২ হাজার মেট্রিক টনের সমান; যার বেশির ভাগ খেজুর গুড় উৎপাদিত হতো বৃহত্তর যশোর জেলা হতে। যশোরের খেজুর গুড়ের সেই ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হলেও এখনো যশোর অঞ্চলের জনমানুষের পরম্পরাগত প্রিয় কথন-‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’। যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক হিসাবমতে জেলার আট উপজেলায় প্রায় আট লাখ খেজুর গাছ আছে। সবচেয়ে বেশি খেজুর গাছ রয়েছে যশোর সদর, মনিরামপুর, শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলায়। যশোর জেলায় বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার টন গুড় ও পাটালি উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক হিসাবে, দেশে ২০১৮-১৯ বছরে দেশে ১ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন খেজুরের রস উৎপাদিত হয়। গড়ে ১০ কেজি খেজুর রস দিয়ে তৈরি হয় প্রায় এক কেজি পাটালি বা গুড়। এ হিসাবে দেশে পাটালি ও গুড় উৎপাদিত হয় ১৭ হাজার মেট্রিক টন। যার গড় বাজার মূল্য ৩৫০ কোটি টাকার মতো। বিবিএসের আরেক হিসাবানুসারে ২০১৮-১৯ বছরে দেশে খেজুর বাগানের পরিমাণ ৬৩ হাজার একর। তবে প্রকৃতার্থে দেশি খেজুরের বাণিজ্যিক বাগানের খুব বেশি সম্প্রসারণ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। শীতকালে নানান ধরনের পিঠা পায়েস খেয়ে রসনা তৃপ্তির জন্য আসল খেজুরের গুড় ও পাটালির ব্যবহার তুলনাহীন হলেও হালে কিছু অসাধু খেজুর গুড় উৎপাদনকারীরা খেজুর গুড়ের সাথে চিনি মিশ্রিত করে ভেজাল করে থাকে। ফলে আসল খেজুর গুড়ের প্রাপ্তি অনেকটা কঠিন হয়েছে পড়েছে।

খেজুরের গুড় থেকে চিনির দাম অনেক কম হওয়ার কারণে খেজুরের গুড়ে এখন চিনি মেশানোর প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশী খেজুর গাছ সম্প্রসারণের জন্যে তেমন কোন বাড়তি জমির প্রয়োজন নেই। চাষযোগ্য জমির আইলে, বিভিন্ন ফল বাগনের আইলে বা মাঝখানে খেজুর গাছ লাগানো যায়। খেজুর গাছের পরিচর্যাও তেমন বেশি নয়। ফলে সামান্য একটু পরিচর্যা করে আসল খেজুর গুড় ও রস উৎপাদন করতে পারলে আমাদের দেশের খেজুর চাষীরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি লাভবান হতে পারেন; সেইসাথে আমরা আমজনতা উপভোগ করতে পারি আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়ের রান্না করা হরেক রকমের পিঠা পায়েস ও খেজুরের রস। দেশি খেজুর গাছ থেকে মানসম্পন্ন রস সংগ্রহ করে আসল খেজুরের গুড় ও পাটালি তৈরির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ হতে প্রথমবারের মতো পাইলটিং হিসেবে কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পে’র আওতায় এ বছরে প্রথমবারের মতো যশোর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় মানসম্পন্ন খেজুর রস ও খেজুরের গুড় উৎপাদনের জন্যে ২টি প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। একেকটিতে প্রদর্শনী খেজুর চাষী/গাছি রয়েছে ৩০ জন। ফলে অত্র যশোর কৃষি অঞ্চলে ৬০ জন খেজুর চাষী/গাছিকে প্রকল্প সহায়তায় প্রশিক্ষণ প্রদান সহ প্রতিটি খেজুর চাষী/গাছিকে প্রকল্পের পক্ষ হতে সরবরাহ করা হয়েছে ধারালো হাসুয়া, গুড় তৈরির প্যান/কড়াই, রস সংগ্রহের হাড়ি, পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, গুড়/পাটালি তৈরির ছাঁচ, মপ/সার্জিকাল ক্যাপ, নিরাপদ রস সংগ্রহের নেট বা জালি সহ অনান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ। বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের খেজুর বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এসব খেজুর চাষি/গাছিদেরকে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন বলে জানালেন প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ রুহুল কবির। প্রকল্পের ফিল্ড মনিটরিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন ইউনিটের দায়িত্বরত অতিরিক্ত উপপরিচালক (সম্প্রসারণ ও সমন্বয়) কৃষিবিদ সেলিম হোসেন যশোর অঞ্চলে নিরাপদ খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন কার্যক্রম তীব্রভাবে মনিটরিং করে চলেছেন। তাঁকে বিশেষভাবে সহায়তা করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার দায়িত্বরত উপপরিচালক কৃষিবিদ বাদল চন্দ্র বিশ্বাস ও কৃষিবিদ ড. মো. আ. মাজেদ ও তাঁদের সহকর্মীবৃন্দ।

খেজুর রসের তৈরি পিঠা পায়েস ছাড়াও আমাদের দেশি খেজুর ফলও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী এবং প্রচণ্ড রকমের পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। পুষ্টিগুণের কারণে সারা বছরই এখন অনেক স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ নিয়মিত খেজুর ফল খেয়ে থাকেন। খেজুর ফলকে ‘ওয়ান্ডার ফল’ হিসাবেও বিবেচনা করা যায়। আয়রন, খনিজ, ক্যালসিয়াম, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফসফরাস এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ, খেজুর স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই উপকারী। খেজুরের পটাসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণসহ স্ট্রোক, কোলেস্টেরল এবং হার্টের রোগ থেকেও রক্ষা করে। খেজুরের আয়রন শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করে। খেজুরের ফাইবার বা আঁশ শরীরে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। খেজুরে চিনি, আমিষ এবং প্রচুর ভিটামিন থাকে। খেজুর গর্ভবতী মায়ের পাশাপাশি গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর জন্মগত রোগ নিরাময়েও সাহায্য করে। খেজুর ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ফল বিধায় চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে এবং রাতকানা রোগ নিরাময়ে কাজ করে। খেজুরের ক্যালসিয়াম শরীরের হাড়ের গঠন মজবুত করে। খেজুরে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ এবং সুক্রোজ পাওয়া যায়। সুতরাং, তাৎক্ষণিক শক্তির জন্য খেজুর খুব উপকারী। যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তারা ডাক্তারের পরামর্শে মেনে কিছু খেজুর খেতে পারেন।

আমাদের দেশি খেজুরও যথেষ্ট সুস্বাদু। সুতরাং দেশি খেজুরকে পক্রিয়াজাতকরণ করে সারা সৌদি খেজুরের মতো সারা বছরই বিকিকিনি করা সম্ভব। খেজুর রস, খেজুর গুড়, খেজুর পাঠালি বা খেজুর ফলের পুষ্টিগুণ যেভাবেই বলি না কেন খেজুর চাষ অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট লাভজনক। তাই প্রকল্প সহায়তায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খেজুরের চাষ বৃদ্ধি ও মানসম্পন্ন খেজুর রস ও গুড় তৈরির জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। যশোর সামাজিক বন বিভাগের উদ্যোগে ২০০৯ সাল থেকে খেজুরগাছ রোপণ করা হচ্ছে। ‘বৃহত্তর যশোরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় জেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ খেজুর গাছের চারা রোপণ করেছে। ওদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউিট তাদের ফার্মি সিস্টেম গবেষণার অংশ হিসেবে পরিক্ষামূলকভাবে আমাদের দেশে সৌদি খেজুর চাষের ওপরে লাগসই গবেষণা অব্যাহত রেখেছে।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি
[email protected]; web: www.drakhtaruzzman.info

 

Wordbridge School
Sonali IT Pharmacy Managment System