• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

যে কারণে তারেক রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অসমাপ্ত রয়ে গেল


নিজস্ব প্রতিবেদক জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
যে কারণে তারেক রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অসমাপ্ত রয়ে গেল

ফাইল ছবি

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক নতুন নয়। বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি-এ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে রাজনৈতিক বক্তব্য, টক শো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টে তাকালে দেখা যায়, এ বিতর্কের পেছনে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার চেয়ে দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাই ছিল বেশি প্রভাবশালী।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমানের বেড়ে ওঠা ছিল অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বাস্তবতা তার শিক্ষাজীবনকে স্বাভাবিক গতিতে এগোতে দেয়নি। 

মাধ্যমিক সার্টিফিকেট অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেক রহমানের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকেও তার মা বেগম খালেদা জিয়া ও ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোসহ গ্রেপ্তার করা হয়। কৈশোরেই বাবাকে হারানো এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা তার জীবনের গতিপথকে ভিন্ন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দেয়।

তারেক রহমান ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থী ছিলেন।

তবে সে সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম অস্থির। হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে বিরোধী আন্দোলন, লাগাতার ধর্মঘট ও সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।

১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ক্যাম্পাসে নিয়মিত ক্লাস হওয়া ছিল বিরল ঘটনা। হলে হলে দখলদারি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করেছিল।

তৎকালীন সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্র শেখর চক্রবর্তী বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেশনজট ছিল ভয়াবহ। ক্লাস ও পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। অনেক ক্ষেত্রেই পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছিল।

শুধু শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়, তারেক রহমান ছিলেন রাজপথের আন্দোলনেরও অংশ। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়ে তিনি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন। এর পরপরই তাকে ও বেগম খালেদা জিয়াকে একাধিকবার গৃহবন্দী করা হয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি মায়ের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী জানান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান হওয়ায় তারেক রহমানের জন্য সে সময়ে প্রকাশ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যাম্পাসে অস্ত্রের দাপট ও গোলাগুলির ঘটনায় তার নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর শঙ্কা ছিল। এই প্রতিকূল পরিবেশ, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় চাপের কারণেই তিনি অনার্স পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি সম্পন্ন না হওয়াকে অযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু রাজনীতিবিদই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পারেননি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য ফরমাল ডিগ্রি অপরিহার্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়। আব্রাহাম লিংকন কিংবা জর্জ ওয়াশিংটনের মতো নেতারাও বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী ছিলেন না।

তারেক রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে অবস্থান করেছেন। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তার একাডেমিক ডিগ্রি অসমাপ্ত থেকে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি তার শিক্ষা, জ্ঞান বা রাজনৈতিক দক্ষতার অভাব নির্দেশ করে না। বরং বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রাম, আন্দোলন ও জীবনের অভিজ্ঞতাই তার জন্য হয়ে উঠেছে বিকল্প পাঠশালা।

শিক্ষার সনদ হাতে না থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রত্যক্ষ অংশীদার হিসেবে তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন শেষ পর্যন্ত রাজনীতির মধ্যেই পূর্ণতা পেয়েছে।

এসএইচ 

Wordbridge School
Link copied!