• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

হাসিনা কি সত্যিই ফিরতে চান, যা বলছে সরকার!


নিজস্ব প্রতিবেদক নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
হাসিনা কি সত্যিই ফিরতে চান, যা বলছে সরকার!

ফাইল ছবি

মৃত্যুদণ্ডের সাজা, বাতিল হওয়া পাসপোর্ট এবং তীব্র প্রতিকূল রাজনৈতিক সমীকরণের মুখে চলতি ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ, সন্দেহ ও রাজনৈতিক গুঞ্জন। এরই মধ্যে সরকারের তরফ থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলকে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কোনো সাধারণ পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে না। তাকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ মূলত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের দল এনসিপির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ঝটিকা মিছিল ছাড়া বড় কোনো সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দলটির সামনে নেই। এর ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং শত শত মামলা তার ফেরার পথকে করে তুলেছে আরও বেশি কণ্টকাকীর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের হতাশা কাটাতে এবং দলের ভেতর নতুন উদ্যম আনতে ফেরার কথা বারবার বললেও বৈরী পরিবেশে তিনি সত্যিই সেই ঝুঁকি নেবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

আইনগত ও কূটনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি বেশ জটিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ২০১৩ সালের বন্দিবিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। তবে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, ভারত সরকার তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ায় এবং চুক্তির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি ধারার সুযোগ থাকায় দিল্লি তাকে এই চুক্তির আওতায় সহজে ফেরত পাঠাবে না। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অভিযোগের প্রকৃতি রাজনৈতিক বা সরল বিশ্বাসে না আনার মতো বিষয়গুলো দেখিয়ে ভারত এই অনুরোধ খারিজ করার ক্ষমতা রাখে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, নেত্রী নিজের বয়স, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে যে কোনো ঝুঁকি নিয়েই ডিসেম্বরে ফিরবেন। বিদেশে অবস্থানরত দলটির নেতারা বলছেন, পরিবার ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা করেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বিকল্প পথ ও দিন সবকিছুই নির্ধারিত রয়েছে। তবে জুলাই আন্দোলনে পতিত সরকারের ভূমিকা নিয়ে দলের পক্ষ থেকে কোনো অনুশোচনার সুর না থাকায় দেশের জনগণ তাকে কতটা আস্থায় নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ফেরাটা কি সম্পূর্ণ শেখ হাসিনার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে, নাকি এর পেছনে ভারত ও ভূরাজনীতির কোনো বড় ফ্যাক্টর কাজ করছে—তা নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার মতো একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ফেরা না ফেরার বিষয়টি কেবল একক কোনো সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি গভীরভাবে জড়িত।

বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ট্রাভেল পাস বা পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্ত বা বিমানপথে তার পক্ষে সহজে প্রবেশের সুযোগ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু ট্রাভেল পাস বা সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করার সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, ফলে তাকে দেশে ফিরতে হলে সম্পূর্ণভাবে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বা বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। অন্যথায় সমঝোতা ছাড়াই আকস্মিক কোনো পদক্ষেপ নিলে তাকে দেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইতোমধ্যেই তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার নির্ধারিত সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে। ফলে ফেরা মাত্রই তাকে আইন অনুযায়ী কাস্টোডিতে নিতে হবে।

সবমিলিয়ে, ডিসেম্বরের এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে। সরকার যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্কতা বাড়াচ্ছে, তেমনি বিরোধী পক্ষও একে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছে। শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ঘোষণা অনুযায়ী দেশে ফিরবেন কি না এবং আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কি না-তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এসএইচ 

Link copied!