• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

হস্তক্ষেপ না হলে স্বতন্ত্রের জয়জয়কার


বিশেষ প্রতিনিধি জানুয়ারি ২, ২০২৪, ০৩:০৯ পিএম
হস্তক্ষেপ না হলে স্বতন্ত্রের জয়জয়কার

ঢাকা : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠে দিনে দিনে অবস্থান শক্ত-পোক্ত হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-অনুসারীদের। প্রচারণায় নেমে সাধারণ ভোটারদের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন তারা। জয়ের বিষয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকেই দৃঢ় আশাবাদী।

তবে তাদের ভয় শুধু ভোটের দিন প্রশাসনিক প্রভাবে কোনো কৌশল খাটানো হয় কি না, তা নিয়ে। কায়দা-কানুন না করলে জয়জয়কার হবে বলে বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভেতরে। অন্তত ২০টি সংসদীয় আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের অনুসারীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ২১৯টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা লড়ছেন। যাদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কোনো না কোনো পর্যায়ের নেতা। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৩০টি আসনে ভোটের মাঠে এগিয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্যদের নিয়ে স্থানীয়দের নানা ক্ষোভ এবারের ভোটে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের পিছিয়ে দিয়েছে। দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতো অনেক আসনে সাধারণ ভোটাররাও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পছন্দ করতে শুরু করেছেন।

গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, রাজশাহী, খুলনা, কিশোরগঞ্জ ও মাদারীপুরসহ আরও কয়েকটি জেলায় নৌকার চেয়ে ভোটের প্রচারণায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। এসব জেলার মধ্যে কোনোটিতে একটি আসন আবার কোনোটিতে একাধিক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হওয়ার মতো অবস্থানে চলে এসেছেন।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, এ নিয়ে কারও কোনো ভয় পাওয়ার কারণ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুবিধা গ্রহণ করে নৌকার কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী করতে আগ্রহী নন।’

পিরোজপুর-২ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট করছেন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। প্রায় ৪০ বছর এ আসনটির রাজা তিনিই। তবে মঞ্জুর নিশ্চিত আসনটি এবার নড়বড়ে করে  তুলেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ। ঈগল প্রতীকের এই প্রার্থী এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন ভোটের মাঠ।

মহারাজের পক্ষে ভোটের লড়াইয়ে থাকা আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, ‘ভোটের মাঠ মহারাজের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কথা হলো সারাদিন ভোট হলো, ফলাফলে কায়দা-কানুন হলো। তাহলে আর এগিয়ে থেকে লাভ হবে কি? হস্তক্ষেপ না হলে শুধু পিরোজপুরেই নয়, সারা দেশে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয়জয়কার হবে।’

একইভাবে আরও অনেক আসনের প্রার্থী ও তাদের অনুসারীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারও মনে করছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকেই এবার জিতবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাঠে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন জানিয়ে তারা বলেন, এখন পর্যন্ত প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

কোথাও কোথাও নৌকার প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করতে চাইলেও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ ও স্বতন্ত্রদের অনুসারীরা আরও বলেন, নৌকা প্রতীক নিয়েও অনেক আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন। কারণ ক্ষমতার রাজনীতিতে এমনভাবে বর্তমান সংসদ সদস্যরা ডুবে ছিলেন তাতে তাদের জনসমর্থন শূন্যের কোঠায় চলে গেলেও টের পাননি তারা।

স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে ভোটের দিন ‘কায়দা-কানুন’ এর ভয় থাকলেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে অঙ্গীকার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছেন সেটি ঠিক থাকলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।

আবার স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করায় তাদের কাছে নৌকা হারলেও তেমন দুশ্চিন্তা করছেন না আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। এ বিষয়টিও স্বতন্ত্রদের সাহস জোগাচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে নৌকার প্রার্থীরা দুর্বল অবস্থায় পড়ে গেলেও নির্বাচন নিরপেক্ষ করার কঠোর নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করেছেন, নৌকা জিতুক আর স্বতন্ত্র জিতুক ভোট নিরপেক্ষ হবে। নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জেতানোর কারও কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে, তার কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার ব্যালটে হাত দেওয়া যাবে না বলে দলীয় শীর্ষ পর্যায়ে এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নির্দেশনা ভাঙার চেষ্টা মেনে নেবেন না প্রধানমন্ত্রী।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘স্বতন্ত্রে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পরিষ্কার বার্তা স্বতন্ত্র নির্বাচনী এলাকায় কারও কোনো নয়ছয় বা পেশিশক্তি ব্যবহার করা একেবারেই চলবে না। সুবিধা নিয়ে যারা জিততে চান তাদের জেতার দরকার নেই বলে মনে করেন দলীয় সভাপতি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ব্যালটে হাত দেওয়ার চেষ্টা করা হলে উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে।’

স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ভোটের মাঠে থাকা পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য আবদুল হক বলেন, ‘আগের নির্বাচনগুলোতে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাইকেল নিয়ে নৌকাকে ডুবিয়ে ছিলেন। আবার সে নৌকায় চড়ে বিজয়ী হয়ে সাইকেলে চলে যাবেন। এ কারণেই আমি তার সমর্থন করি না। মহিউদ্দিন মহারাজ ঈগল মার্কা নিয়ে নির্বাচন করলেও তিনি জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।’ মহিউদ্দিন মহারাজ বিপুল ভোটের ব্যাবধানে জিতবে বলেও আশা তার।

নেছারাবাদ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম কবির বলেন, ‘আমি প্রত্যক্ষভাবে মহারাজের সঙ্গে এখনো নামিনি। তবে বেশিরভাগ মানুষ মহারাজের পক্ষে। এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক আলোচনা চলছে যে, বিশেষ পরিকল্পনা করে মঞ্জুকে জিতিয়ে নেওয়া হয় কি না।

তবে এখানে জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগ সবাইকে বোঝানোর ও বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে চলেছে যে, ভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। ভোটে কেউ বাড়তি সুযোগ পাবেন না।’

আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই ও জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহিবুল হোসেন মাহিম মনে করছেন, ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

এ বিষয়ে ঈগল মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, ‘আমি মঞ্জু সাহেবের কাছে শক্তিশালী প্রার্থী নই। তবে যদি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে ৮০ ভাগ জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে বিজয়ী করে পাঠাবেন। আমার বিজয়ের ক্ষেত্রে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখি না, যদি না প্রশাসনিকভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী সম্পর্কে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মালেকার মোড় বাজারে বসে কথা হয় মো. সাকিন উদ্দিনের সঙ্গে। রাজশাহী-৬ আসনের শালুয়া ইউনিয়ন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার সাকিন বলেন, ‘কায়দা-কানুন ছাড়া নৌকার প্রার্থী কোনোভাবেই এ আসনে জিতবে না। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রায়হানুল হক রায়হান এলাকার সন্তান। সুষ্ঠু ভোট হলে রায়হানের জয় কেউ আটকাতে পারবে না।’

খুলনা-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন। তিনি ফুলতলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। কিন্তু আসনটিতে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয়জয়কার দেখছেন অনেকেই। ডুমুরিয়া উপজেলার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের খর্নিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নারায়ণ মল্লিক।

স্বতন্ত্র প্রার্থী সম্পর্কে এ নেতা বলেন, ‘এখানকার বর্তমান এমপির দুঃশাসন থেকে বাঁচতে চায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সাধারণ মানুষ সবাই। ফলে সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী আকরামের দিকে ঝুঁকে আছেন। সুষ্ঠু ভোট হলে ঈগলই জিতবে এ আসনে। আমাদের প্রত্যাশা জয় ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ প্রধানমন্ত্রী এবার কাউকে দেবেন না।’ সূত্র : দেশ রূপান্তর

এমটিআই

Wordbridge School
Link copied!