• ঢাকা
  • শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

চাহিদার দ্বিগুণ কোরবানির পশু প্রস্তুত, লাভের আশা খামারিদের


ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি  মে ১৬, ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম
চাহিদার দ্বিগুণ কোরবানির পশু প্রস্তুত, লাভের আশা খামারিদের

ছবি: প্রতিনিধি

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পাবনার ঈশ্বরদীতে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হয়েছে। অনেকেই ভোগান্তি এড়াতে এখন থেকেই ভাগে বা এককভাবে কোরবানির পশু কিনতে শুরু করেছেন। ক্রেতারা হাট, খামার ও গৃহস্থের বাড়ি থেকে নিজেদের পছন্দের পশু কিনছেন। সারাবছর লালন-পালন করে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা গরু ও ছাগল বিক্রি শুরু করেছেন খামারি ও গৃহস্থরা। অনেক খামারি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও গরু বিক্রি করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন। এবার কোরবানির আগে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ না করলে দেশীয় খামারিরা লাভবান হবেন বলে আশা করছেন তারা।

খামারিরা জানান, ভালো দামের আশায় তারা সারাবছর গরু-ছাগল লালন-পালন করেছেন। এবার বাজারদর মোটামুটি ভালো রয়েছে। কোরবানির আগ পর্যন্ত এই দর বজায় থাকলে খামারি ও গৃহস্থরা কিছুটা হলেও লাভের মুখ দেখবেন। তবে ঈদের আগে যদি ভারতীয় গরু দেশে ঢুকে পড়ে, তাহলে লোকসানের আশঙ্কাও করছেন তারা।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় গবাদিপশুর খামারকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে জীবিকা নির্বাহের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এক দশক আগেও উপজেলায় খামার বলতে তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু বর্তমানে গ্রামগঞ্জ এলাকা কিংবা বাড়ির নির্ধারিত স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় গবাদিপশুর খামার।

আজ শনিবার (১৬ মে) সরেজমিনে এখানকার পশুহাটগুলো ঘুরে এবং কোরবানির পশুর ক্রেতা-বিক্রেতা, খামারি ও গৃহস্থদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, ২০১৪ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার পর পাবনার ঈশ্বরদীতেও বাণিজ্যিক গবাদিপশুর খামার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বর্তমানে উপজেলার অনেক শিক্ষিত তরুণ ও যুবক উদ্যোক্তা বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছেন এই খাতে। এর পেছনে রয়েছে বাজারে গরুর মাংসের ব্যাপক চাহিদা, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মাংসের ব্যবহার এবং ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির বিশাল বাজার। এতে গত কয়েক বছরে পশুর চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ঈশ্বরদীর এসব খামারিরা।

ঈশ্বরদী উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ঈদুল আজহার কোরবানি উপলক্ষে ৩ হাজার ৫৫ জন খামারি প্রায় ৭৪ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত করছেন। এই উপজেলায় আনুমানিক কোরবানির পশুর চাহিদা ৪৩ হাজারের মতো। এসব খামারে পালন করা গবাদিপশু উপজেলার কোরবানির চাহিদা পূরণ করে এখানকার অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে কোরবানি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাংসের চাহিদা পূরণে খামারিদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আগে একসময়ে অনেক কৃষক-কৃষাণী পশুপালন করাকে সম্মানহানিকর মনে করলেও বর্তমানে শিক্ষিত তরুণ খামারিরা পশুপালন করে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।

উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় পশু ক্রয়-বিক্রয়ের হাট উপজেলার অরণখোলায় পশুর হাটের আশেপাশে শতাধিক গবাদিপশুর খামার গড়ে উঠেছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে এখানকার খামারি ও গৃহস্থদের উদ্বৃত্ত পশু। বড় গরুর চাহিদা স্থানীয়ভাবে কম থাকায় এগুলো বিক্রির জন্য যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামে গিয়ে দেখা যায় অনেক খামার গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ৩ থেকে সাড়ে ৩ মণ ওজনের গরু ৯০-৯৫ হাজার টাকা, ৫ মণ ওজনের গরু ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৮ থেকে ১০ মণ ওজনের গরু ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। কোরবানির গরুর প্রতি মণের বাজারদর ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। কোরবানির ঈদের হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা খামারি ও গৃহস্থরা বলছেন, এবার ঈদে মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি। তবে কোরবানির পশুর দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

খামারিরা আরও জানান, ৩ থেকে সাড়ে ৩ মণ ওজনের একটি গরু সারাবছর লালন-পালনে প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। এই আকারের গরুকে প্রতিদিন খেসারি, ধান, ভুট্টা ও ভুসি মিশ্রিত দানাদার খাবার ৪ কেজি এবং কাঁচা ঘাস ও খড় ১৫-১৬ কেজি খাওয়াতে হয়। বড় গরুর ক্ষেত্রে খাবারের পরিমাণ আরও বেশি লাগে। এছাড়া খাবার, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ রয়েছে।

উপজেলার অরণকোলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় শতাধিক গরুর খামার রয়েছে। প্রতিটি খামারেই কোরবানির উপযোগী গরু রয়েছে। পছন্দের গরু কিনতে অনেকেই খামার ঘুরে দেখচ্ছেন। পাশাপাশি গরু ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীরাও দরদাম করছেন। অনেক খামারি অনলাইনেও গরু বিক্রি করছেন। এসব খামারে ৩ থেকে ১২ মণ ওজনের গরু বেশি রয়েছে। খামারগুলোতে শাহিওয়াল, দেশাল, ঘির, হরিয়ানা, ফ্লাগবি, মীরকাদেমী, ফ্রিজিয়ান, জার্সি, ব্রাহামা ক্রস, রাখি শাহিওয়ালা, ওলিবারী শিবসহ ১৫-২০ জাতের গরু দেখা যায়।

অরণকোলা গ্রামের তানভীর ডেইরি খামারের স্বত্বাধিকারী গোলাম কিবরিয়া সোহান বলেন, আমাদের খামারে কোরবানির জন্য ১৫০ থেকে ২০০ গরু প্রস্তুত করা হয়। পর্যায়ক্রমে বিক্রি করতে করতে এখন ১০০ গরু আছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন। আমাদের খামারে সর্বোচ্চ ১৪০০ কেজি ওজনের গরু ছিল, যেটি দুই বছর লালন-পালন করেছি। দুই দিন আগে সেটি বিক্রি হয়েছে। এবছর বাজারের অবস্থা মোটামুটি ভালো, দাম খুব বেশি বা কম নয়। গরুর খাদ্যের জন্য তিনি ৮ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেছেন। তার খামারে একজন শ্রমিক মাসিক ১৬ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন। খাবারের দাম বাড়ায় খরচও বেড়ে গেছে। একটি গরু সারাবছর লালন-পালন করে ১০-১২ হাজার টাকা লাভ করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিদেশ থেকে গরু আমদানি না হলে দেশীয় খামারিরা লাভবান হবেন। আমাদের দাবি, সরকার যেন সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি রাখে যাতে কোনো ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করতে না পারে।

মুনতাহা ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী বাচ্চু প্রামানিক বলেন, আমরা খামারে গরু লালন-পালন করে অনলাইন ও সরাসরি বিক্রি করি। গবাদিপশুর ব্যবসায় খুব একটা লোকসান হয় না। খামারি নিজে খামার দেখভাল করলে লোকসান হয় না। অনলাইনে যারা গরু কিনবেন তারা খামার ও সাইনবোর্ড দেখে কিনবেন। সাইনবোর্ড থাকা খামারিরা সাধারণত প্রতারণা করে না। তবে সরাসরি এসে দেখে গরু কেনাই সবচেয়ে ভালো।

তোহা ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী আমিনুল হক বলেন, এখানকার খামারগুলোতে কোরবানির গরুর চাহিদা বেশি। ভারতীয় গরু যদি দেশে ঢুকে তাহলে দাম কমে যাবে। আর যদি না আসে তাহলে খামারিরা কিছুটা হলেও লাভবান হবেন। তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা যেকোনো মূল্যে ভারতীয় গরু প্রবেশ ঠেকাতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি গরুর ওজন প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কেজি হবে। এখন অনেকেই হাটে গিয়ে গরু কেনার ঝামেলা এড়িয়ে সরাসরি খামার থেকে গরু কিনে নিয়ে যান। ঘাস, খাবার ও শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়েও প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকার বেশি আয় হয় এই খামারির।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের সার্জন ডা. মো. ফারুক হোসেন জানান, উপজেলায় এখন অনেক শিক্ষিত যুবক খামার গড়ে তুলে আত্মকর্মসংস্থানের চেষ্টা করছেন এবং তারা লাভবান হচ্ছেন। আধুনিক পদ্ধতিতে খামার ব্যবস্থাপনা করলে এ খাত থেকে আরও বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। আমরা সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোছা. আকলিমা খাতুন বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে হাটে আনিত পশুর জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ভেটেরিনারি সার্জন ডাক্তার মো. ফারুক হোসেনকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের ২টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, গবাদিপশুর খামার বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আমরা চেষ্টা করছি আরও খামার বৃদ্ধি করার জন্য, যাতে করে উপজেলার মাংস ও দুধের চাহিদা পূরণ করে অন্যান্য উপজেলাতেও সরবরাহ করা যায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে খামারিদের প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও পরামর্শসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এসএইচ 
 

Link copied!