ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো চালু হওয়া আইটি–সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। প্রবাসী ভোটার, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এই পদ্ধতি চালু করে নির্বাচন কমিশন। চূড়ান্ত ফলাফল বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পোস্টাল ব্যালটে দেওয়া ভোটের সিংহভাগই পেয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের ৩০০ আসনে মোট পোস্টাল ভোটারের সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ২০ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৪ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৫৭ হাজার ৮৯৮টি ভোট।
পোস্টাল ব্যালটে দেওয়া ভোটের বড় অংশ গেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীদের ঝুলিতে। দুটি দল মিলে পেয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার ২৫৮ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৭৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে একক দল হিসেবে এগিয়ে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি পেয়েছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১১৪ ভোট, যা মোট পোস্টাল ভোটের ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বিএনপি পেয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার ১৪৪ ভোট, অর্থাৎ ৩০ দশমিক ২৮ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৫২ হাজার ৮৪০ ভোট, যা মোট ভোটের প্রায় ৫ শতাংশ।
এই তিন দল মিলে পেয়েছে ৮ লাখ ৬৩ হাজার ১২৮ ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ৮১ দশমিক ১৩ শতাংশ। যদিও সামগ্রিক নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয় পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, পোস্টাল ব্যালটে এগিয়ে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
নির্বাচনের আগে থেকেই পোস্টাল ভোটকে সম্ভাব্য ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে আলোচনা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সারাদেশে মাত্র দুটি আসনের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এই ভোট। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ–৪ এবং মাদারীপুর–১ আসনে পোস্টাল ব্যালটের ভোট যুক্ত হওয়ার পর ফলাফল পাল্টে যায়।
সিরাজগঞ্জ–৪ আসনে কেন্দ্রভিত্তিক ভোট গণনায় বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলী ৭৬৫ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। তবে পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান ২ হাজার ১৭৯ ভোট এবং বিএনপি প্রার্থী পান ৮২০ ভোট। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলে ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী।
মাদারীপুর–১ আসনেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কেন্দ্রের ভোটে বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তার ৭৮০ ভোটে এগিয়ে থাকলেও পোস্টাল ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা ১ হাজার ৩৯৮ ভোট পান। বিএনপি প্রার্থী পান ২৩৩ ভোট। এতে চূড়ান্ত হিসাবে ৩৮৫ ভোটে জয়ী হন হানজালা।
পোস্টাল ব্যালটের ভোটের হার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৭২টি আসনে ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে রংপুর–২ আসনে, যেখানে ভোটের হার ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে পঞ্চগড়–২, ঠাকুরগাঁও–২, ঠাকুরগাঁও–৩ ও চট্টগ্রাম–১ আসনে কোনো পোস্টাল ভোট পড়েনি।
দলীয় শীর্ষ নেতাদের ক্ষেত্রেও পোস্টাল ভোটে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা–১৭ আসনে সামগ্রিক ফলাফলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিজয়ী হলেও পোস্টাল ব্যালটে তিনি পরাজিত হন। এই আসনে তিনি পান ১ হাজার ২৫৬ ভোট, আর জামায়াতের প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জমান পান ২ হাজার ৩২৮ ভোট। তবে বগুড়া–৬ আসনে তিনি পোস্টাল ব্যালটেও এগিয়ে থেকে জয় পান।
ঢাকা–১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান চূড়ান্ত ফলাফলের পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটেও জয়ী হয়েছেন। পোস্টাল ব্যালটে তিনি পান ২ হাজার ৭৯০ ভোট, যেখানে বিএনপি প্রার্থী পান ১ হাজার ৯২০ ভোট।
এদিকে ঢাকা–১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম চূড়ান্ত ফলাফলের পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটেও জয় পান। তিনি পান ১ হাজার ৮৩৪ ভোট, আর বিএনপি প্রার্থী এম এ কাইয়ুম পান ৮৬৪ ভোট।
পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অনেক জেলায় চূড়ান্ত ফলাফলে পরাজিত হলেও পোস্টাল ভোটে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের প্রার্থীরা। কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনীর বেশ কয়েকটি আসনে এই চিত্র স্পষ্ট। কুমিল্লার ১১টি আসনের পোস্টাল ব্যালটে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরাই এগিয়ে ছিলেন। আবার চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে পোস্টাল ভোটে জয় পেয়েছে বিএনপি প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রবাসী ও দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পোস্টাল ভোটের ফলাফল সামগ্রিক নির্বাচনী ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে—সেটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এসএইচ







































