ঢাকা : মানুষ প্রশংসাপ্রেমী। সে তার স্বীয় কর্মগুণে বাহ বাহ পেতে চায়। মানুষ কাজ করে, সফলতার স্বপ্ন বুনে, জগত মাঝে শ্রেষ্ঠ হতে চায়। মানুষ চায় পৃথিবীর বুকে সে সর্বোচ্চ সম্মানি ও প্রশংসিত ব্যক্তি হোক। তার মর্যাদা হোক আকাশচুম্বী। চারিদিকে কেবল তার বিজয়ধ্বনি বাজুক। এরকম হাজারো অলীক স্বপ্ন মানুষ তার মনের মাঝে লালন করে। মানুষের লোভ দুটি জিনিসে। সম্পদ আর প্রশংসায়। মানুষ যতই ধনী হয় না কেন, সম্পদের লোভ কিছুতেই কমে না। যার যত ধন আছে, সে আরো চায়। তেমনি মানুষের যতই প্রশংসা করা হোক না কেন, এতে সে বাহ্যিকভাবে তৃপ্ত হলেও আত্মতৃপ্ত হয় না। মানুষ মুখ দিয়ে না বললেও প্রশংসার জন্য তার প্রবল মনোবাঞ্ছা থাকে। সে চায় পুরো পৃথিবী তার প্রশংসায় লিপ্ত হোক। মানুষের এই চাওয়া, এই স্বপ্ন আমরণ বেঁচে থাকে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষ কেবল চাইতেই থাকে। মানুষের ধারণা-একসময় সে সফল হবে। গোটা বিশ্ব তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করবে।
প্রশংসা মানুষের সহজাত ধর্ম। অভিনন্দন- অভ্যর্থনা, বাহ বাহ মানুষকে আত্মমর্যাদাবোধে জাগিয়ে তোলে। ভালো কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। সফলতার দিকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু অতিরিক্ত প্রশংসা মানুষকে বিপথগামী করে। নীতির পথ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। আমরা মুসলমান। আমাদের ধর্ম ইসলাম। ইসলাম শান্তি ও মানবতার ধর্ম। সত্য ও নীতির ধর্ম। ইসলাম যেমনভাবে আল্লাহর সৃষ্টি মানবজাতকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দান করেছে। সর্বোচ্চ প্রশংসায় প্রশংসিত করেছে। ঠিক তেমনই মানবজীবনে অতিরিক্ত প্রশংসা করাকে ইসলামে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যারা স্বীয় কৃতকর্মে সন্তুষ্ট এবং তারা যা করেনি তার জন্য প্রশংসা প্রার্থী। এরূপ লোকদের সম্পর্কে ধারণা করো না যে, তারা শাস্তিবিমুক্ত; বরং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি।’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত-১৮৮)
কারো সামনে কিংবা পেছনে অতিরিক্ত প্রশংসা করা থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠোর নিষেধ করেছেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কারো সামনে তার প্রশংসা করা তার পিঠে ছুরি মারা বা তার গলা কেটে ফেলার সমান।’ (আদাবুল মুফরাদ : ৩৩৫) অন্য একটি হাদিসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেউ তোমাদের সামনা সামনি প্রশংসা করলে তার মুখে তোমরা পাথর ছুঁড়ে মারো।’ (আদাবুল মুফরাদ : ৩৪০) জনৈক সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অপর এক সাহাবি সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসায় লিপ্ত হলেন। তা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আফসোস! তুমি তো তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে!’ কথাটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন। অতঃপর বললেন, ‘যদি কারো প্রশংসা করতেই হয়, তবে সে যেন এভাবে বলে যে, আমি তার ব্যাপারে এমন এমন ধারণা পোষণ করি। কারণ তার প্রকৃত হিসাব মহান আল্লাহতায়ালাই জানেন।’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত, হাদিস নং-৪৮২৭)
অতিরিক্ত প্রশংসা ও তোষামোদের দ্বিমুখী ক্ষতি রয়েছে। যে ব্যক্তি প্রশংসা করে আর যার প্রশংসা করা হয়, তারা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত। প্রশংসাকারীর ক্ষতি, অতিরিক্তি প্রশংসায় তিন রকমের গোনাহ হয়ে থাকে। এক. মিথ্যাচারের গোনাহ। নিজেদের গোপন কু-উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যারা বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এমন অবাস্তব প্রশংসা করে, তারা মূলত মিথ্যাচারীর অন্তর্ভুক্ত। আর মিথ্যা হলো পাপসমূহের মা। এখান থেকেই সব পাপের জন্ম হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার জবান ও গোপনাঙ্গের হেফাজত করতে পারবে না, সে জাহান্নামি। কাজেই বুঝা গেল মিথ্যাচারীদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। দুই. মুনাফিকির গোনাহ। যে বিষয়ে নিজের আস্থা ও বিশ্বাস নেই, সে বিষয়ে অন্য কারো প্রশংসা করা প্রকৃতপক্ষে মুনাফিকির শামিল। আর মুনাফিকদের ঠিকানা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে। তিন. অন্যকে অবজ্ঞা করার গোনাহ। কোনো ব্যক্তি যদি কারো এমন প্রশংসা করে যে, তার প্রশংসার ফলে যার প্রশংসা বা গুণগান গাওয়া হচ্ছে, তাতে ওই ব্যক্তি অন্যদের চোখে অবজ্ঞার পাত্রে পরিণত হয়। তাহলে প্রশংসাকারী নীচুতা ও হটকারিতার পাপে লিপ্ত হবে।
অতিরিক্ত প্রশংসার ফলে প্রশংসিত ব্যক্তিও দুই রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এক. অতিরিক্ত প্রশংসার ফলে প্রশংসিত ব্যক্তির মনে দাম্ভিকতার জন্ম নেয়। আর অহংকার-দাম্ভিকতার মাধ্যমেই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম পাপ সংঘটিত হয়েছিল। আমাদের দেশে প্রচলিত একটি বাক্য আছে, ‘অহংকার পতনের মূল।’ শয়তানের অনুসরণে যারা অহংকার দেখাবে, তারাও বড় গোনাহগার। মহান আল্লাহ অহংকারীদেরকে অপছন্দ করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা অহংকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা নাহল) দুই. মিথ্যা ও অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে প্রশংসিত ব্যক্তির মনে নিজ সম্পর্কে অনুরূপ ধারণার জন্ম হয়। কাউকে অপমান কিংবা অহেতুক সমালোচনার বদ-মানসিকতা তার মাঝে তৈরি হয়। এতে সে অন্যের সঙ্গে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ব্যবহার করতে শুরু করে। মানুষের কাছ থেকে মিথ্যে প্রশংসাবাণী শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। আর এরূপ ব্যক্তিদের কোরআনে কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং কারো প্রশংসা, তোষামোদ, খোশামুদ করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত না করাই ইসলামের সুষ্ঠু বিধান। আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াত নসীব করুন! অতিরঞ্জন, অহংকার, মুনাফিকি, মিথ্যাচার থেকে মুক্ত রাখুন! আমিন।
লেখক : ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক
[email protected]







































