• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০
আ.লীগে কোন্দল

শাস্তিতেই সমাধান দেখছেন মাঠ পর্যায়ের নেতারা


বিশেষ প্রতিনিধি ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৪, ০১:১৪ পিএম
শাস্তিতেই সমাধান দেখছেন মাঠ পর্যায়ের নেতারা

ঢাকা : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগে সৃষ্ট কোন্দল ও বিভেদ দূর করতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঢাকায় ডেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ বর্ধিত সভায় এই নির্দেশনা দেওয়া হলেও নেতাকর্মীরা মনে করছেন কোন্দলের জন্য দায়ী নেতাদের কঠোর শাস্তি না দিলে এর সমাধান হবে না।

মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দলের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-কোন্দল, নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধ করতে ক্ষমতার চর্চা করা ও বলয় সৃষ্টিকারী নেতাদের পুরস্কৃত না করে শাস্তির আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প নেই।

জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে নানামুখী সংকট নিয়ে চলতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। তবে এর আগেও দলের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা, মারামারি-হানাহানি, দ্বন্দ্ব-কোন্দল নানা সময়ে বেকায়দায় ফেলেছে আওয়ামী লীগকে। কেন্দ্র থেকে নানামুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেও সমাধান আসেনি।

সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিতদের নির্বাচন করার অনুমতি দেওয়ার পর দলীয় কোন্দল আরও বেড়েছে। সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীরা খুনাখুনি পর্যন্ত করেছেন। এখনো প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি অব্যাহত থাকায় সহিংসতা বন্ধ করা যায়নি।

বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলাদলি-সহিংসতা ও দ্বন্দ্ব-কোন্দল দূর করতে শনিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশের সর্বস্তরের নেতাকে ঢাকায় গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। প্রায় ৪৭ মিনিট ধরে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন নেতাকর্মীদের সামনে।

বিশেষ এ বর্ধিত সভায় দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে নৌকার সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি খোলাসা করে তিনি আরও বলেন, নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্বের বিষয়ে তিনি অবগত। এবারের নির্বাচন স্বতন্ত্র ও দলীয়ভাবে করতে গিয়ে অনেকের মন কষাকষি, নানা রকম কিছু হয়ে গেছে। যেটা হয়ে গেছে, সেটা হয়ে গেছে, এখন ভুলে যেতে হবে। সবাই এক হয়ে কাজ করতে হবে।

জনগণের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখে কাজ করতে হবে। যদি কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দেয় তাহলে সেটা সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা আছেন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কোনো আত্মঘাতী সংঘাত যেন না হয় সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেছেন, দোষারোপ করার অর্থ হয় না।

গত ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এখনো ঘটছে। বেশিরভাগ সহিংসতাই ঘটছে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে। বিশেষ বর্ধিত সভার আয়োজন করে সব নেতাকর্মীকে দিকনির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তবে নেতাকর্মীদের অভাব-অভিযোগ শোনা হয়নি।

বিশেষ বর্ধিত সভায় দলীয় সভাপতির দিকনির্দেশনা সংকট সমাধানে কতটুকু গুরুত্ব পাবে তা নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের এক ডজন নেতার সঙ্গে কথা হয়। তারা মনে করেন, শুধু নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘ দিনের এই সংকট একদিনে দূর করা অসম্ভব।

তারা বলেন, গত ১৫ বছরে ক্ষমতার চর্চা করা ও বলয়ভিত্তিক রাজনীতি করা নেতাদের আওয়ামী লীগে কদর বেড়েছে বলে দ্বন্দ্ব-কোন্দল, মারামারি-হানাহানির রাজনীতি দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। কদর বাড়া নেতারা নিজেকে দলের জন্য বিকল্পহীন ভাবতে শুরু করেছেন। ফলে ক্ষমতার চর্চা, বলয়ের রাজনীতি চলমান রয়েছে।

তৃণমূলের নেতাদের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেননি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও। তবে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে রাজি হননি কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পদের নেতারা। তারা দাবি করেন, সাংগঠনিক সংকট দূর করতে হলে কেন্দ্রীয় নেতাদেরও ব্যক্তিস্বার্থের-বলয় সৃষ্টি করার রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে।

মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, ক্ষমতার চর্চা করা ও বলয় সৃষ্টিকারী নেতাদের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না তৃণমূলে। ফলে বিশেষ বর্ধিত সভা হলেও তৃণমূলের সহিংসতা-দ্বন্দ্ব-কোন্দল দূর হবে বলে তারা মনে করেন না।

তারা বলেন, ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতি করা সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের সৃষ্টি করে রাখা বলয় না ভাঙলে আওয়ামী লীগের ভেতরে জেঁকে বসা কোন্দল কোনোভাবেই দূর হবে না। ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করা নেতাদের চিহ্নিত করতে হবে, তাদের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। তা না হলে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার রাজনীতি অব্যাহত থাকবেই। ক্ষমতার বাইরে গেলে দলের দুর্বল অবস্থা টের পাওয়া যাবে বলে মনে করেন ঢাকায় আসা তৃণমূলের নেতারা।

এ ছাড়া শাস্তি দিয়ে আবার তা প্রত্যাহারের মতো ঘটনা ঘটলে সেটা কোন্দল দূর না করে বরং আরও গভীর করবে বলে মনে করেন মাঠ পর্যায়ের এই নেতারা। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগে ক্ষমতার চর্চাকারী নেতারা বলয় সৃষ্টি করছেন।

চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দুলাল পাটোয়ারী বলেন, ব্যক্তিস্বার্থ ও বলয় সৃষ্টি করা নেতাদের পুরস্কৃত না করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া সাংগঠনিক এই সংকটের সমাধান আছে বলে মনে করি না। তবুও দলের দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে আশাবাদী জানিয়ে বলেন, নেত্রীর নির্দেশনা যারা শোনার তারা শুনলেই দ্বন্দ্ব-কোন্দল দূর হয়ে যাবে।

টাঙ্গাইল জেলার বসাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা কাজী অলিদ ইসলাম বলেন, আসলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব-কোন্দল চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এ সুযোগ নিয়ে দলের সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকারে নিজের লোক বসানোর রাজনীতি করে আসছিলেন। ফলে দলের ভেতরের বঞ্চিত ও ত্যাগী অংশ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে নিজের লোক বসানো ও বলয় সৃষ্টি করার রাজনীতিদের অবস্থান পোক্ত করার সুযোগ বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় করার সিদ্ধান্তে দ্বন্দ্ব-কোন্দল অনেকখানি দূর হয়ে যাবে। মানে সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।

মানিকগঞ্জের সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ইসরাফিল হোসেন বলেন, নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতা-সহাবস্থানের রাজনীতি করতে চাইলে নিশ্চয়ই পরিবর্তন আসবে। তাছাড়া, যারা দ্বন্দ্ব-কোন্দল সৃষ্টির রাজনীতি করেন তারা সেটা করবেনই। তবে হ্যাঁ, কিছুটা হয়তো হবে। যদি আন্তরিক হন ওনারা।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃণমূলের কোনো কোনো নেতাকে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে কিছুটা ভালো হতো। অন্তত যেসব জেলা-উপজেলায় নেতারা কোন্দল সৃষ্টি করার রাজনীতি করছেন তাদের এবং ওই জেলা-উপজেলার প্রতিপক্ষ গ্রুপকে কথা বলার সুযোগ দিলে বোঝা যেত, কেস স্টাডির জন্য সুবিধা হতো।’

ইসরাফিল বলেন, ক্ষমতার চর্চার জন্যই এসব দ্বন্দ্ব-কোন্দল। আবার ক্ষমতার চর্চার রাজনীতি যিনি করছেন তিনিই দলের সুযোগ-সুবিধা পেতে থাকেন, এসবও আছে বিশৃঙ্খল রাজনীতির কারণে।

পটুয়াখালীর মঠবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেলিম মাতুব্বর বলেন, ‘দীর্ঘদিনের কোন্দল-দ্বন্দ্ব একদিনের নির্দেশনায় দূর করা যাবে না। দূর করতে কোনো উপায় আছে, সেটাও মনে করেন না তৃণমূলের এই নেতা।

তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ধরে একটি রীতি চালু রয়েছে তৃণমূলের যে নেতা যত বেশি ক্ষমতাবান হওয়ার রাজনীতি করেছেন সেই নেতা তত বেশি সুবিধা পেয়েছেন। ফলে নিজেকে বিকল্পহীন মনে করে রাজনীতি করেন, ক্ষমতার চর্চা করেন। তার মতে, তৃণমূলের রাজনীতিতে ক্ষমতার চর্চা করার নেতাদের সুবিধা না দিয়ে কেন্দ্র থেকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দ্বন্দ্ব-কোন্দল এগুলো দূর করা যেতে পারে।

সেলিম মাতুব্বর বলেন, গণভবনে বড় পরিসরে না ডেকে বিভাগ ওয়ারি ডাকা হলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া, সুফল আশা করা যায় না। সূত্র : দেশ রূপান্তর

এমটিআই

Wordbridge School
Link copied!