ঢাকা : আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। মানুষ সামাজিক জীব। এই পৃথিবীতে বসবাসের জন্য মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। বেঁচে থাকার জন্য একটি সুন্দর সংসার গড়ে তোলে। আর এই সংসারকে সুখের নীড় গড়ার নিমিত্তে গৃহিণী হয়ে ঘরে আসে নারী। কানায় কানায় আনন্দে ভরে উঠে সোনার তরীর এই সংসার। নারীর মর্যাদা ও অধিকার বলতে তার অধিকারের স্বীকৃতি, কর্তব্যের সঠিক বিশ্লেষণ ও পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তজার্তিক তথা সবক্ষেত্রে তার অবদানের যথার্থ মূল্যায়নকেই বুঝায়। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতসহ নারীকে যথাযথ মূল্যায়ন ও তাদের মর্যাদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা করেছে। যুগে যুগে অবহেলিত ও উপেক্ষিত নারী সমাজকে ইসলাম নারীর মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে। নারী-পুরুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম। উল্লেখ্য যে, পবিত্র কোরআনে সুরা নিসা ‘মহিলা’ শিরোনামে নারীর অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কিত একটা সুরা রয়েছে। ইসলাম নারীর ওপর সব প্রকার অবিচার ও অত্যাচার নিষিদ্ধ করে, অধিকার দিয়েছে দাম্পত্য ক্ষেত্রে, স্বামী নির্বাচনে, মোহর, বিবাহ, উত্তরাধিকার মালিকানা সূত্রে। দিয়েছে নারীকে সম্মান ও জানমালের নিরাপত্তা।
উত্তরাধিকার অংশ নির্ধারণ : ইসলাম পূর্বযুগে নারীরা উত্তরধিকার সূত্রে কোনো প্রকার সম্পত্তির মালিক হতো না। ইসলাম উত্তরাধিকার সূত্রে নারীদের অংশ নির্ধারণ করেছে। নারীরা তার পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার সূত্রে এক ভাইয়ের অর্ধেক এবং স্বামীর সম্পত্তির অংশ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে। স্বামী কর্তৃক মহরানা পেয়ে থাকে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার সূত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় অধিক সম্পত্তি পেয়ে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমান অংশ পায়।
ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত : ইসলামপূর্ব যুগে সামাজিকভাবে নারীর ন্যূনতম অধিকার ছিল না। ইসলাম নারী-পুরুষ, কন্যার মধ্যে প্রচলিত প্রভেদ দূর করে প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহতায়ালা নারী ও পুরুষকে একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এর মানে এই না যে, কর্তৃত্বদানের মাধ্যমে শুধু পুরুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। বরং নারী-পুরুষের প্রকৃতিগত ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে একের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-পুরুষ একে অপরের সহযোগী।
নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিত : ইসলামপূর্ব যুগে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রে নারীদের স্বাধীনতা ছিল না। ইসলাম নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। ইসলাম নারীকে স্বামী নির্বাচনে স্বাধীনতা দিয়েছে। নারীর মর্যাদা রক্ষার্থে মোহর ধার্য করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে নারীদের মর্যাদা ছিল সর্বজনবিদিত। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নারীর ওপর পুরুষের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও অধিকার রয়েছে পুরুষের ওপর।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-২২৮) নারীর যা কিছু অর্জন করবে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারো হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যা কিছু পুরুষরা অর্জন করবে, তা তাদেরই অংশ হবে; আবার যা কিছু নারীরা উপার্জন করবে, তাদেরই অংশ হবে।' (সুরা নিসা, আয়াত- ৩২)
কর্মক্ষেত্রে নারী : ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নারীর মর্যাদা রক্ষা করে পর্দার সাথে যে কোনো কর্মে নিয়েজিত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। কোনো নারী আশ্রয়হীন কিংবা পরিবারের তাগিদে নিজ মর্যাদা রক্ষা করে হালাল উপায়ে আয় রোজগার করার অধিকার রাখে। জীবিকা অর্জন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ্রহণের সুযোগ দিয়ে ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছে।
মাতা হিসেবে নারী : নারীর মর্যাদা ক্ষমতা ও অধিকার পুরুষের চেয়ে বেশি। তবে তাদের দায়িত্ব কম। কিন্তু নারীর এমন একটি দায়িত্ব আছে যা শত পুরুষের দায়িত্বের চেয়ে বড় ও সম্মানিত। তার নাম মাতৃত্ব। জগৎ সংসারের শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে যে মানুষটির একটু সান্ত্বনা আর স্নেহ-ভালোবাসা আমাদের সব বেদনা দূর করে দেয়, তিনিই হলেন মা। পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর শব্দটি হচ্ছে মা। মায়ের চেয়ে আপনজন পৃথিবীতে আর কেউ নেই। দুঃখে-কষ্টে, বিপদে-সংকটে যে মানুষটি স্নেহের পরশ বিছিয়ে দেন, তিনি হচ্ছেন আমাদের সবচেয়ে আপনজন, মা। প্রতিটি মানুষ পৃথিবীতে আসা এবং বেড়ে ওঠার পেছনে প্রধান ভূমিকা একমাত্র মায়ের। যার তুলনা অন্য কারো সঙ্গে চলে না। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির সম্পর্ক, যা একটু আঘাত পেলেই প্রতিটি মানুষ ‘মা’ বলে চিৎকার দিয়ে জানান দিয়ে থাকে।
একদিন হজরত মুয়াবিয়া ইবনে জাহিমা আসসালামী (রা:) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি জিহাদ করতে ইচ্ছুক। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী? জবাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মা আছেন? তিনি বললেন, আছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মায়ের সেবায় নিয়োজিত থাকো, কেননা তার পায়ের নিচেই জান্নাত।' এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার কাছে কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার? তিনি বললেন, মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা- (বোখারি-মুসলিম)।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী: ইসলাম নারী-পুরুষ সকলকেই ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি জাগতিক বৈষয়িক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করার নির্দেশ প্রদান করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তার সৃষ্টিরাজি সম্পর্কে জানার জন্য তার বান্দাদের নির্দেশ প্রদান করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- "প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।" (বায়হাকি-১৬১৪)
মূলত সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই নারী-পুরুষের বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে সভ্যতার ঐতিহাসিক যুগে এক সময় মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠলেও পরে পর্যায়ক্রমে পুরুষতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। ইসলাম নারীর মর্যাদা স্বাতন্ত্র্য ও তার ন্যর্য অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। অথচ সামপ্রতিক বিশ্বে ইসলামে নারীর অধিকার নিয়ে ব্যপক বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নারীর যর্থাথ মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানের অভাব ও সেক্যুলারতন্ত্র তার জন্য দায়ী। তাছাড়া, রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসিত অনেক মুসলিম রাষ্ট্রও এর জন্য দায়ী। এসকল রাষ্ট্র নারীর মর্যাদাকে মিশ্রিত ও ভুলুণ্ঠিত করেছে এবং নারীর যথাযথ অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও আরো অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে- কুসংস্কার কবলিত মুসলিম সমাজ নারীর মর্যাদা দিতে পারেনি। অশিক্ষার কবলে পড়েও মুসলিম সমাজ নারীর যর্থাথ মর্যাদার প্রতিফল ঘটাতে পারেনি। আমাদের সমাজে ধর্মের নামে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। যা আদৌ ইসলাম সমর্থন করে না। বিশেষত, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নেতিবাচক প্রভাব।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুগে নারীর অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি ছিল সর্বজনিত। ইসলামিক পরিমন্ডলে জীবনযাপন করেও অনেক মুসলিম নারী পেশাদারিত্বে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালমা (রা.) ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উম্মুল খায়ের, ইকরামা বিনতে আতরাশ (রা.) ও উম্মে সিনান (রা.) এরকম অসংখ্য নারী সাহাবী প্রতিরক্ষামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন। আয়েশা (রা.) হাদিস বর্ণনা, ইসলামী আইন, ফিকহ, ইতিহাস, বংশলতিকা, কবিতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। ফাতেমা বিনতে আব্বাস ইসলামী আইনবিদ ছিলেন। তিনি মিসর ও দামেস্কের প্রভাবশালী নেত্রী ছিলেন। এরকম শত শত দৃষ্টান্ত রয়েছে ইসলামে। কিন্তু বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রেক্ষাপটে নারীরা পশ্চাৎপদ, অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত। ফলে আধুনিক বিশ্ব এটাকে ইসলামের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। যাতে করে তারা মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যার জন্য বর্তমান মুসলিম বিশ্বই দায়ী। মুসলিম রাষ্টগুলোও নারীদের জন্য সকল ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বর্তমান আরব রাষ্ট্রসমূহে নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাধীনতা ইত্যাদি ইস্যুতে পশ্চিমারা পানি ঘোলাটে করতে অপচেষ্টায় ব্যস্ত।
নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ইস্যুতে মুসলিম বিশ্ব বিভ্রান্তিতে ভোগছে। নারীর মর্যাদার ব্যপারে ইসলামের যে নীতি রয়েছে তার অপব্যাখা করে ইসলামের শত্রুরা মুসলিম জাতিকে দিকভ্রান্ত করছে। বিশ্ব ইতিহাসে মুসলিম সমাজই প্রথম নারীকে নায্য মর্যাদায় আসীন করেছে। সুতরাং সকল বাস্তবতায় নারীর মর্যাদা, অধিকার মুল্যায়নের সময় এসেছে। বর্তমান ইসলামী বিশেষজ্ঞদের কর্তব্য ইসলামী আইনের আলোকে নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য ও তাদের অধিকার সুস্পষ্টভাবে সকলের কাছে বিবৃত করা। নারীকে শিক্ষা-দীক্ষায় সমুন্নিত করে বাস্তবিক ময়দানে নারীকে দায়িত্ববান করে গড়ে তুলতে হবে। যাতে করে মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্বের সকল নারীর কল্যাণ সাধিত হয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়






































