• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

যেভাবে প্রথম শিকার ধরেন কুখ্যাত এপস্টেইন ও তার প্রেমিকা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
যেভাবে প্রথম শিকার ধরেন কুখ্যাত এপস্টেইন ও তার প্রেমিকা

মার্কিন বিচার বিভাগের সদ্য প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নতুন করে আলোচনায় এনেছে কুখ্যাত ধনকুবের জেফরি এপস্টেইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের ভয়ংকর অপরাধচক্র। লক্ষাধিক নথি, ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে—কীভাবে পরিকল্পিতভাবে কিশোরী ও তরুণীদের টার্গেট করা হতো এবং ধীরে ধীরে যৌন নির্যাতনের ফাঁদে আটকানো হতো।

এবিসি নিউজের বরাতে জানা যায়, এসব নথির মধ্যে রয়েছে ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি, ব্যক্তিগত ইমেইল, ডায়েরির নোট, এফবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতের নথি। এসব তথ্য একত্রে একটি সুসংগঠিত ‘গ্রুমিং সিস্টেম’-এর চিত্র তুলে ধরে, যার মূল কারিগর ছিলেন ম্যাক্সওয়েল।

প্রথম শিকারের খোঁজ মেলে ১৯৯৪ সালে

নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েলের প্রথম শিকার বেছে নেওয়ার ঘটনা ঘটে ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি। স্থানটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে অবস্থিত নামকরা ইন্টারলোচেন স্কুল অব দ্য আর্টস-এর একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প। সেখানে অংশ নেওয়া ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী—যাকে আদালতের নথিতে ‘জেন ডো’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে—ছিলেন তাদের লক্ষ্যবস্তু।

ফ্লোরিডার পাম বিচ থেকে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে ওই ক্যাম্পে একদিন ক্লাসের বিরতিতে পার্কের বেঞ্চে একা বসে ছিলেন জেন ডো। ঠিক তখনই তার সঙ্গে আলাপ শুরু করেন এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েল। নিজেকে শিল্পী ও তরুণ প্রতিভার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তুলে ধরে এপস্টেইন কিশোরীটির বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করেন।

দুর্বলতাকে অস্ত্র বানানো

জেন ডোর বাবা তখন এক বছর আগেই মারা গেছেন, পরিবারে চলছে আর্থিক টানাপোড়েন। এই সুযোগটিই কাজে লাগান তারা। পরিবার, আর্থিক অবস্থা এবং বাসস্থান সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করে একপর্যায়ে জেন ডোর মায়ের ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন এপস্টেইন।

কয়েক মাস পর ফোন করে মা ও মেয়েকে চায়ের দাওয়াতে আমন্ত্রণ জানানো হয় পাম বিচে এপস্টেইনের বিলাসবহুল বাড়িতে। ২০২০ সালের এক ক্ষতিপূরণ মামলায় বলা হয়, সেদিন এপস্টেইন নিজেকে একজন ‘মানুষকে সাহায্য করতে ভালোবাসেন’—এমন দয়ালু ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন। এতে মুগ্ধ হয়ে জেন ডোর মা তাকে ‘গডফাদার’ বলে ডাকতে শুরু করেন।

বিশ্বাসের আড়ালে ভয়াবহতা

১৪ বছর বয়স থেকে জেন ডোর এপস্টেইনের বাড়িতে যাওয়া-আসা নিয়মিত হয়ে যায়। সুইমিংপুল, সিনেমা দেখা, শপিং—সব মিলিয়ে শুরুতে বিষয়টি তার কাছে আনন্দেরই মনে হয়েছিল। এপস্টেইন মেয়েটির মায়ের জন্য নগদ টাকা দিতেন, এমনকি গানের প্রশিক্ষণের খরচও বহন করতেন।

কিন্তু বাড়ির পরিবেশ ছিল অস্বাভাবিক। অনেক সময় সুইমিংপুল এলাকায় নগ্ন অবস্থায় ঘোরাফেরা করতেন গিলেইন ম্যাক্সওয়েল। জেন ডো অস্বস্তি প্রকাশ করলে তাকে বলা হতো—‘এটা বড়দের ব্যাপার’। ম্যাক্সওয়েল নিজেকে তার অভিভাবকসুলভ বড় বোন হিসেবে উপস্থাপন করতেন।

একপর্যায়ে এপস্টেইন জেন ডোর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে কথা বলেন। অভিনেত্রী ও মডেল হতে চাওয়ার কথা জানালে তিনি দাবি করেন, ‘ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট’-এর মালিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সফল হতে হলে ক্যামেরার সামনে স্বাচ্ছন্দ্য হতে হবে—এই যুক্তিতেই শুরু হয় যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ অধ্যায়।

নেটওয়ার্কের বিস্তার

এপস্টেইন ফাইলস থেকে জানা যায়, এই চক্রে নতুন মেয়েদের আনার কাজ অনেক সময় আগের ভুক্তভোগীরাই করত। ২০০৭ সালে এক ১৬ বছর বয়সী কিশোরী এফবিআইকে জানান, তারই এক স্কুল সহপাঠী তাকে এপস্টেইনের বাড়িতে কাজের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে তথাকথিত ম্যাসাজ, পোশাক খোলা ও শারীরিক স্পর্শের বিনিময়ে টাকা দেওয়া হতো।

নিয়ম ছিল স্পষ্ট—যত বেশি নগ্নতা ও স্পর্শ, তত বেশি পারিশ্রমিক। নতুন কাউকে আনতে পারলে জনপ্রতি ২০০ ডলার করে দেওয়া হতো। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে এই চক্রে যুক্ত মেয়েদের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। একজন ২৩ বছর বয়সী হওয়ায় তাকে ‘অতিরিক্ত বড়’ বলে বাদ দেওয়া হয়। এপস্টেইনের ভাষায়, “যত কম বয়স, তত ভালো।”

ভয়, নীরবতা ও ভাঙা জীবন

ভুক্তভোগীদের অনেকেই দীর্ঘ সময় মুখ খুলতে পারেননি। ভয়, লজ্জা ও মানসিক ট্রমা তাদের নীরব করে রেখেছিল। প্রায় দুই দশক পর জেন ডো প্রথম নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। অনেকেই এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েলকে ‘পরিবার’-এর মতো মনে করতেন, কারণ তারা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অভিনয় করতেন।

তবে ২০২০ সালে এক ভুক্তভোগী ইমেইলে ম্যাক্সওয়েলকে সরাসরি ‘সাইকোপ্যাথ’ বলে আখ্যা দেন। ২০২৩ সালে আরেকজন এফবিআইকে জানান, নাম প্রকাশ হলে নিজের জীবন ও ক্যারিয়ার আরও বিপন্ন হবে—এই ভয়েই তিনি সাক্ষ্য দিতে চাননি।

বিচার ও পরিণতি

এই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে প্রথম দিককার অভিযোগ আসে ১৯৯৬ সালে। মারিয়া ফার্মার নামের এক নারী এফবিআইকে জানান, এপস্টেইন তার কিশোরী বোনদের ছবি চুরি করে বিক্রি করেছেন এবং পুলিশে গেলে ভয়াবহ হুমকি দিয়েছেন।

বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেন জেফরি এপস্টেইন। অন্যদিকে, গিলেইন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে শিশু যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন।

চলতি সপ্তাহে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর আওতায় প্রায় ৩৫ লাখ পৃষ্ঠার নথি, ২ হাজার ভিডিও এবং প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি প্রকাশ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। এসব নথিতে এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী বহু ব্যক্তির নাম উঠে আসায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

এম

Wordbridge School
Link copied!