ছবি : প্রতিনিধি
ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম চার মাসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে মোট ২২৫টি কাজ ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত ‘ডাকসুর চার মাস: কার্যবিবরণী ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে একই সঙ্গে ‘দায়িত্বগ্রহণের প্রথম চার মাসে ডাকসুর কার্যক্রমের বিবরণী’ এবং ‘প্রতিনিধি সম্মেলন ২০২৫’ শীর্ষক দুটি স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
চার মাসের কার্যবিবরণী উপস্থাপন করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, “আমরা ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ১০ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের ফল ঘোষণার দিনই ঘোষণা দিয়েছিলাম—আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের কাজের জবাবদিহি করব। তার ধারাবাহিকতায় গত ডিসেম্বরে ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সম্মেলন করি। সেখানে আমরা আমাদের দুই মাসের কাজ তুলে ধরেছিলাম এবং হল প্রতিনিধিরাও তাদের কাজ ও সমস্যাগুলো জানিয়েছিলেন।”
তিনি বলেন, “আজ দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসে ডাকসু যে সব কাজ করেছে এবং যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো সবার সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাকসুর কাজের ডকুমেন্টেশনের জন্য দুটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে।”
জিএস আরও বলেন, “নির্বাচনের আগে আমরা যে ইশতেহার দিয়েছিলাম এবং অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ইশতেহারগুলোও আমরা নোট ডাউন করেছিলাম। সবগুলো ইশতেহার বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। এমন কোনো ইশতেহার নেই, যেখানে আমরা কাজ করিনি বা উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। এরপরও যদি শিক্ষার্থীদের চোখে মনে হয় কোনো বিষয়ে আমরা কাজ করিনি, সেটি আমাদের জানালে অবশ্যই আমরা তা নিয়ে কাজ করব।”
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, “আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনকে সামনে রেখে আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বাজেটের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে ডাকসুকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “আজ বিশ্ববিদ্যালয় ১০৪ বছরে পা রেখেছে, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে; অথচ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা হয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্তরে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা চায় না শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর থাকুক, চায় না স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠিত হোক।”
ভিপি আরও বলেন, “এই অকার্যকর অবস্থান বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করা হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, নানাভাবে কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তবু আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে গেছি।”
তিনি বলেন, “আজ আমরা চাইলে বলতে পারতাম—বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফান্ড পাইনি, তাই কাজ করতে পারিনি। কিন্তু আমরা সেই পথ বেছে নিইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই, দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরের রিসোর্স পারসন এবং দাতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ এগিয়ে নিয়েছি। আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আজ পর্যন্ত প্রায় ২২৫টি কাজ সম্পন্ন করেছি, যা ৩৩টি খাতে বিভক্ত। এর বিস্তারিত তথ্য আমাদের ওয়েবসাইট ও বুকলেটে প্রকাশ করা হয়েছে।”
সাদিক কায়েম বলেন, “এই প্রেস কনফারেন্স শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়। সামনে জাতীয় নির্বাচন রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যেই আসুক, আমরা এমন একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার দেখতে চাই—যারা স্পষ্টভাবে বলবে কী করেছে, কী করেনি। আমাদের প্রতিটি কাজের ইনস অ্যান্ড আউট শিক্ষার্থী ও দেশবাসীর সামনে উন্মুক্ত। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দলগুলোও যেন এই স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি অনুসরণ করে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত চার মাসে ডাকসুর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবছর নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রেজুলেশন পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পাঠানো; একই সভায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদের এখতিয়ার বহির্ভূত রেজুলেশন বাতিল; আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে এয়ার কন্ডিশনিংসহ জরুরি সংস্কার; ১৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার নতুন ছাত্রী হল নির্মাণ ত্বরান্বিত করতে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা; ২৮০০ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা এবং দ্রুত পাঁচটি হলের ভিত্তিপ্রস্তরে সম্মতি আদায়।
এছাড়া কার্জন হলের কমনরুমে ছাত্রীদের ইবাদতের জন্য নির্ধারিত স্থান ও মসজিদ সংস্কার, কমনরুম ও টিএসসির নামাজের স্থানে নতুন কার্পেট প্রদান, ডাকসুর ওয়েবসাইট চালু, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণ সংস্কার, এক্স-রে, ইসিজি, এনালাইজার, মাইক্রোস্কোপসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ, আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের সঙ্গে ৫০ শতাংশ ছাড়ে চিকিৎসাসেবার জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান এবং ১৮ বার হলভিত্তিক ছারপোকা নিধন কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানানো হয়।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক এলাকা ও ছাত্রী হলে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, Serenity Session: Breathe & Bloom শীর্ষক মানসিক স্বাস্থ্য সেশন, Breast Cancer Awareness সেমিনার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সহযোগিতায় মেডিকেল ক্যাম্পে প্রায় ৩০০০ শিক্ষার্থীকে সেবা প্রদান এবং বারডেম হাসপাতালের সহযোগিতায় স্বল্পমূল্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার চেকআপের ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর উপলক্ষে ডাকসু আয়োজন করে বিজয় কুইজ প্রতিযোগিতা, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্মরণ অনুষ্ঠান, ‘বিজয়ের রঙতুলি’ আলপনা উৎসব, বিজয় দিবসে সাইকেল র্যালি ও স্ট্যান্ট শো, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতিচারণ ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ‘বিজয়ের কথা’ প্রকাশনার জন্য লেখা আহ্বান। পাশাপাশি সীরাতুন্নবী (সা.) সন্ধ্যা, সীরাত প্রতিযোগিতা, নবান্ন উৎসব, নাট্যোৎসবসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে চারটি সেমিনার আয়োজন, সাতটি আন্তর্জাতিক জার্নালে ফ্রি অ্যাক্সেস, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির আলো ও ফ্যান সংযোজন, পরীক্ষার হল বরাদ্দ প্রথা বাতিল, সফট স্কিল প্রশিক্ষণ, চারটি প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপ, স্পোকেন ইংলিশের চারটি কোর্স, বাংলাদেশ স্কিল সামিট আয়োজন এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ২৯টি ই-রিসোর্স সাবস্ক্রাইবের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এছাড়া বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটদের অংশগ্রহণে ফায়ারফাইটিং ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ, ৫০০ শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ, ১৮টি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, পাঁচটি সেলফ ডিফেন্স প্রশিক্ষণ, ছাত্রীদের জন্য পৃথক জিম নির্মাণ শুরু, ৩৬ বার পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মসূচি, শব্দ দূষণ রোধে ১০ কিলোমিটার রান এবং COP-30 উপলক্ষে ঢাবি–জাবি সাইকেল র্যালি আয়োজন করা হয়েছে।
পরিবহন খাতে জরাজীর্ণ বাস পরিবর্তনে প্রায় দুই কোটি টাকার বাজেট নিশ্চিত, সব রুটে সান্ধ্যকালীন বাস চালু, ১৯টি ইলেকট্রিক শাটল চালু, সব ছাত্রী হলকে শাটল সার্ভিসের আওতায় আনা এবং ক্ষণিকা রুটের বাসের এক্সপ্রেসওয়ে টোল ফ্রি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কমনরুম-রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসীমউদ্দীন খান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেসারী, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ, মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়া এবং কার্যনির্বাহী সদস্যদের মধ্যে সাবিকুন নাহার তামান্না, ইমরান হোসাইন, মোছা. আফসানা আক্তার, তাজিনুর রহমান, রায়হান উদ্দীন, আনাস ইবনে মুনির, মো. রাইসুল ইসলাম ও মো. শাহিনুর রহমান।
পিএস







































